রবিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২১, ০৭:৪৪ পূর্বাহ্ন

অতিথি পাখির সখা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সিলভিয়া আক্তার
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার ১ ডিসেম্বর, ২০২০
  • ৭৬৫

শীত মানেই প্রাণের দোলা। শীত মানেই ভালোবাসার বার্তা। শীত মানেই প্রকৃতির নতুন রূপ। আর এই শীত ঘিরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকগুলোতে আগমন ঘটে অতিথি পাখির।

ক্যাম্পাস সেজে উঠে অন্যরকম সজ্জায়। বলা হয়ে থাকে অতিথি পাখির সখা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। ছোট বড় লেকে লাল শাপলার ফাঁকে পাখির মেলার চোখ ধাধানো সৌন্দর্য এর এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। প্রতিবছরের ন্যায় এবারও দেখা মিলেছে অতিথি পাখির। পাখির কলকাকলি, ঝাঁকে ঝাঁকে বিচরণ, জলকেলি আর খুনসুটিতে মুখর হয়ে উঠেছে পুরো ক্যাম্পাস।

নভেম্বরের শুরু থেকেই অতিথি পাখিরা আসতে শুরু করে এ ক্যাম্পাসে। শীত বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে পাখির সংখ্যা। এসব পাখি আসে সুদূর সাইবেরিয়া, চীন, মঙ্গোলিয়া ও নেপাল থেকে। কারণ এ সময় ঐ সব দেশে প্রচুর তুষারপাত হয়। এ তুষারপাত পাখিরা মানিয়ে নিতে না পেরে বাংলাদেশের মতো নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে চলে আসে। শীত চলে গেলে তারাও চলে যায় তাদের আপন ঠিকানায়।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রাণিবিদ্যা বিভাগের তথ্যমতে, ১৯৮৬ সালে সর্বপ্রথম এখানে অতিথি পাখি আসে। তখন ক্যাম্পাসে ৯৮ প্রজাতির পাখি দেখা যেত। ধীরে ধীরে পাখির সংখ্যা বাড়তে থাকে। তবে বর্তমানে লেকগুলোতে ৫০-৬০ প্রজাতির পাখি আসে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আঙিনায় যেসব অতিথি পাখি আসে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য- সরালি, পিচার্ড, গাগের্নি, মুরগ্যাধি, মানিকজোড়, কলাই, নাকতা, জলপিপি, ফ্লাইপেচার, কোম্বডক, পাতারি, চিতাটুপি, লাল গুড়গুটি, টিটিহাঁস, মেটেহাঁস, বুনোহাঁস, বালিহাঁস ইত্যাদি। বর্তমানে হাঁসপাখি’ পাতি সরালি’র প্রাধান্যই বেশি।

শীতের সকালে পাখির কিচিরমিচির আওয়াজে ঘুম ভাঙে এ ক্যাম্পাসের শিক্ষক শিক্ষার্থীদের। সন্ধ্যা ও ভোরে কুয়াশাচ্ছন্ন আকাশ আর তীব্র শীত লক্ষ্য করার মতো। প্রতিবছর এই কুয়াশা ঢাকা শীতের ক্যাম্পাসকে বরণ করে নিতে থাকে নানান রকম আয়োজন। হীম উৎসব, পাখি মেলা, প্রজাপতি মেলা ইত্যাদি। পাওয়া যায় নানান রকম পিঠাপুলি। ক্যাম্পাস রাঙে নতুন রঙে।
করোনাভাইরাস মহামারির কারণে ক্যাম্পাস এখন শিক্ষার্থী শূন্য।

কোলাহল না থাকায় অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর অতিথি পাখির সংখ্যা বেশি বলে ধারণা করছেন পাখি গবেষকরা। ক্যাম্পাসের ছোট বড় লেকগুলোর মধ্যে পরিবহন চত্বরের লেক, ওয়াইন্ডলাইফ রেসকিউ সেন্টারের পাশের লেক ও রেজিস্ট্রার ভবনের সামনের লেক, বোটানিক্যাল গার্ডেন সংলগ্ন লেকে অতিথি পাখির সমাগম সবচেয়ে বেশি হয়। কিন্তু যে লেকগুলোতে আগে তাদের আনাগোনা ছিলোনা এ বছর সেখানেও দেখা যাচ্ছে তাদের। নতুন প্রশাসনিক ভবনের সামনের লেক ও পরিবহন চত্বর সংলগ্ন লেকে এবার পাখির উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি। দীর্ঘ বন্ধে ক্যাম্পাস যেনো এখন শুধুই পশুপাখির রাজত্ব। চারদিকে শুধু সবুজ গাছগাছালি আর পশুপাখির মেলা। ক্যাম্পাস ফিরে পেয়েছে তার প্রাণ।

উষ্ণতা ও নিরাপত্তার খোঁজে ছুটে আসা এই পাখিদের নিরাপত্তার জন্যও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। পাখি সংরক্ষণে সচেতনতা বৃদ্ধি লক্ষ্যে পাখিমেলার আয়োজন করে। লেকের পাশের গাছগুলোতে পাখিদের নিরাপত্তার জন্য সচেতনতামূলক বিলবোর্ড টানানো হয়, যেখানে লেখা আছে- পাখিদের বিচরণ ক্ষেত্র, পাখিদের দিকে ঢিল ছুড়বেন না, লেকের পাড়ে পার্কিং নিষেধ অথবা হর্ন বাজাবেন না।

শীতের শুরু থেকেই দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দর্শনার্থীদের আনাগোনা। যান্ত্রিক শহরের কোলাহল থেকে বিরতি নিয়ে একটু প্রশান্তির আশায় তারা ছুটে যায় ঢাকার অদূরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে করোনাভাইরাস মহামারীর জন্য দর্শনার্থীদের সংখ্যা কিছুটা কম। শীতের আবহাওয়া, লেকের লাল শাপলা আর পাখিদের কলকাকলি মুগ্ধ করে তোলে পাখিপ্রেমী দর্শনার্থীদের। এবার ক্যাম্পাসও সেজেছে নতুন রুপে। অন্যান্য বারের থেকে ভিন্ন। প্রকৃতিই যেনো বরণ করে নিচ্ছে দর্শনার্থীদের।

জাবির সবুজ ক্যাম্পাস এখন নৈসর্গিক শোভায় ও অতিথি পাখির কলতানে মুখরিত। কোলাহল শূন্য ক্যাম্পাস, শীতের ঠান্ডা হাওয়া, কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল, রৌদ্রজ্জ্বল দুপুর, লেকগুলোতে লাল শাপলা আর পাখির কিচিরমিচির সব মিলিয়ে যেনো এক অন্য জগৎ।

লেখকঃ শিক্ষার্থী, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

নিউজটি শেয়ার করুন


এ জাতীয় আরো খবর..