বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২০, ০২:৪৭ পূর্বাহ্ন

অবৈধ উপার্জনের ভয়াবহতা

মুফতী মাহমুদ হাসান
  • আপডেট টাইম : ৩ জুলাই, ২০২০
  • ১৫১৮ বার পঠিত

মানবজীবনে অর্থনীতির গুরুত্ব অপরিসীম। এটি মানুষের জীবন নির্বাহের অন্যতম চালিকা শক্তি হিসেবে সমাদৃত, মানব জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে পরিগণিত। তাই জীবিকা নির্বাহের জন্য ইসলাম উপার্জনের(অর্থনীতির) অনেক গুরুত্বারোপ করছে।

জীবিকা নির্বাহের জন্য উপার্জনের গুরুত্ব ইসলামে যেমনি রয়েছে, ঠিক তেমনি হালাল উপার্জনের গুরুত্ব ও অত্যাধিক। ইসলাম মানুষের জন্য যাবতীয় জীবনোপকরণকে সহজসাধ্য, সুস্পষ্ট, ও পবিত্র করার নিমিত্বে সঠিক ও বৈজ্ঞানিক নির্দেশনা দিয়েছে। অতএব নির্দেশনা বহির্ভূত যাবতীয় উপার্জনই হারাম বা অবৈধ হিসেবে বিবেচিত।

ইসলামের বক্তব্য হল মানুষকে নিজের সার্মথ্য ও যোগ্যতানুযায়ী নিজেই নিজের প্রয়োজনীয় অর্থ ও দ্রব্য সামগ্রীর সন্ধান করবে। এটি মানুষের অন্যতম অধিকার। তবে ইসলাম মানুষকে এ অধিকার দেয়নি যে, সে অর্থ সম্পদ উপার্জনের জন্য স্বীয় খেয়াল খুশিমত যে কোন পন্থা অবলম্বন করতে পারবে। তাইতো ইসলাম অর্থসম্পদ উপার্জনের ক্ষেত্রে হালাল-হারামের পার্থক্য সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে। সমাজ রাষ্ট্র ও ব্যাক্তির জন্য কল্যানকর যাবতীয় ব্যবস্থাকে ইসলাম হালাল করেছে। এবং যা ব্যক্তি ও সমাজের অকল্যাণ তা হারাম করেছেন।

আমার এই প্রবন্ধে বৈধ পন্থা উপেক্ষা করে, হারাম পন্থা অবলম্বন করে অর্থ উপার্জন করলে কি ভয়ংকর পরিণতি হবে যথাক্রমে তা উপস্থাপনের প্রয়াস চালাবো ইনশাআল্লাহ।

হারাম উপার্জনের ক্ষতিকর দিকসমূহ

১.হারাম উপার্জন আল্লাহর নির্দেশ অবজ্ঞা করার শামিল
হালাল খাওয়ার নির্দেশ

يَا أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا.

(হে রাসূলগণ! আপনারা উত্তম (হালাল) রিযিক থেকে আহার করুন এবং নেক আমল করুন।)

তিনি মুমিনদেরকেও বলেছেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ.

(হে ঈমানদারগণ! তোমরা আমার প্রদত্ত হালাল রিযিক থেকে আহার কর।)

আল্লাহ তাআলা কোনটি হালাল ও কোনটি হারাম তা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। যে হারাম পথ বেছে নিবে সে আল্লাহর নির্দেশকে অবজ্ঞা করলো এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ করলো। উপার্জনের ক্ষেত্রে হালাল উপায় অবলম্বন করতে হবে। যারা হালাল ও হারামের প্রশ্নে সতর্কতা অবলম্বন করে না,
⭐তাদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সতর্ক করে বলেন,

يأتي علي الناس زمان لا يبالي الماء ما اخذ منه من الحلال ام من الحرام (البخاري٢٠٥٩)

‘মানুষের নিকট এমন একটি সময় আসবে, যখন ব্যক্তি কোনো উৎস থেকে সম্পদ আহরণ করছে, তা হালাল না হারাম, সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ করবে না।’ [বুখারি : ২০৫৯]

২.হারাম উপার্জন জাহান্নামে যাওয়ার কারণ।
হারাম হতে সৃষ্ট শরীর জান্নাতে যাবে না

হযরত জাবির রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

إِنّهُ لَا يَدْخُلُ الْجَنّةَ لَحْمٌ نَبَتَ مِنْ سُحْت، النّارُ أَوْلَى بِهِ.

এমন শরীর কখনো জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যা হারাম দ্বারা বর্ধিত। জাহান্নামই তার উপযুক্ত স্থান। 📖-(মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৪৪৪১; মুসান্নাফে আব্দুর রায্যাক, হাদীস ২০৭১৯; মুসনাদে আবদ ইবনে হুমাইদ, হাদীস ১১৩৮)

⭐নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার হযরত কা‘ব বিন উজরাহ রা.-কে ডেকে বললেন, হে কা‘ব! শুনে রাখো, ঐ দেহ জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যা হারাম হতে সৃষ্ট। কেননা জাহান্নামের আগুনই তার অধিক উপযোগী। 📖-জামে তিরমিযী, হাদীস ৬১৪; আলমুজামুল কাবীর, তবারানী, ১৯/২১২

৩.হারাম উপার্জন জান্নাতে যাওয়ার প্রতিবন্ধক।

রসুল সা: এরশাদ করেন,
لاَ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ جَسَدٌ غُذِّيَ بِالْحَرَامِ
অর্থাৎ ‘ঐ দেহ জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যা হারাম দ্বারা পরিপুষ্ট হয়েছে’।📖[দারেমি ২৮১৮]

৪.হারাম উপার্জন দুয়া কবুলে বাধা।

মানুষের প্রত্যহিক ও জাগতিক জীবনের চাহিদার কোন অন্ত নেই। আর তার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মহান স্রষ্ট্রার অনুগ্রহের, ভূমিকাই সবচেয়ে বেশী। আর এর জন্য প্রয়োজন একান্তে তাঁর কাছে দোয়া করা। মহান আল্লাহ তায়ালাও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন দুয়া কবুল করার। ইবাদত ও দুআ কবুল হওয়ার ব্যাপারে হালাল খাদ্যের অনেক প্রভাব রয়েছে। খাদ্য হালাল না হলে ইবাদত ও দুআ কবুল হওয়ার যোগ্য হয় না।

🌟হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

« أيها الناس إن الله طيب لا يقبل إلا طيبا وإن الله أمر المؤمنين بما أمر به المرسلين فقال ( يا أيها الرسل كلوا من الطيبات واعملوا صالحا إنى بما تعملون عليم) وقال (يا أيها الذين آمنوا كلوا من طيبات ما رزقناكم) ». ثم ذكر الرجل يطيل السفر أشعث أغبر يمد يديه إلى السماء يا رب يا رب ومطعمه حرام ومشربه حرام وملبسه حرام وغذى بالحرام فأنى يستجاب لذلك ».

তরজামা: হে লোক সকল! আল্লাহ তাআলা হলেন পবিত্র। আর তিনি পবিত্রতা ছাড়া কবুলই করেন না। আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে তাই নির্দেশ দিয়েছেন যা রাসূলগণকে দিয়েছেন।  তিনি বলেছেন “হে রাসূলগণ পবিত্র বস্তু আহার করুন এবং সৎকাজ করুন। আপনারা যা করেন সে বিষয়ে আমি পরিজ্ঞাত”। (সূরা মুমিনুন-৫২) তিনি অন্যত্র ইরশাদ করেন “হে ঈমানদারগণ, তোমরা পবিত্র বস্তু-সামগ্রী আহার কর, যেগুলো আমি তোমাদেরকে রুযী হিসাবে দান করেছি। (সূরা বাকারহ -১৭২) এরপর এক লোকের কথা বললেন যে দীর্ঘ সফর করে আসে। এবং অত্যন্ত ব্যাকুলভাবে দু‘ হাত তুলে আল্লাহর দরবারে বলতে থাকে, ইয়া পরওয়ারদেগার! ইয়া রব! । কিন্তু যেহেতু সে ব্যক্তির পানাহার সামগ্রী হারাম উপার্জনের, পরিধেয় পোষাক- পরিচ্ছদ হারাম পয়সায় সংগৃহীত, এমতাবস্থায় তার দেয়া কি করে কবুল হতে পারে?।  📖(মুসলিম শরীফ, হাদীস নং ২৩৯৩)

🌟ইবন আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছেঃ

قَامَ سَعْدُ بْنُ أَبِي وَقَّاصٍ ، فَقَالَ : يَا رَسُولَ اللَّهِ ، ادْعُ اللَّهَ أَنْ يَجْعَلَنِي مُسْتَجَابَ الدَّعْوَةِ ، فَقَالَ لَهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ” يَا سَعْدُ أَطِبْ مَطْعَمَكَ تَكُنْ مُسْتَجَابَ الدَّعْوَةِ ، وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ ، إِنَّ الْعَبْدَ لَيَقْذِفُ اللُّقْمَةَ الْحَرَامَ فِي جَوْفِهِ مَا يُتَقَبَّلُ مِنْهُ عَمَلَ أَرْبَعِينَ يَوْمًا ، وَأَيُّمَا عَبْدٍ نَبَتَ لَحْمُهُ مِنَ السُّحْتِ وَالرِّبَا فَالنَّارُ أَوْلَى بِهِ “ص

ইবন আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছেঃ ‘‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট একদা এ আয়াতটি তেলাওয়াত করা হল। ‘‘হে মানবমন্ডলী ! পৃথিরীর হালাল ও পবিত্র বস্ত্ত-সামগ্রী ভক্ষন কর।’’ তখন সাদ ইবন আবি ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহু দাঁড়িয়ে বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আল্লহর কাছে দু’আ করুন যেন আমার দু’আ কবুল হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে সা‘দ, তোমার পানাহারকে হালাল কর, তবে তোমার দু’আ কবুল হবে।’’ 📖 [ ইমাম তাবারানী, মু‘জামুল আওসাত, খ. ৬, পৃ. ৩১০   ]

৫.হারাম উপার্জন ইবাদত কবুলের অন্তরায় ।

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: تُلِيَتْ هَذِهِ الْآيَةُ عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: {يَا أَيُّهَا النَّاسُ كُلُوا مِمَّا فِي الْأَرْضِ حَلَالًا طَيِّبًا} [البقرة: 168] فَقَامَ سَعْدُ بْنُ أَبِي وَقَّاصٍ، فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، ادْعُ اللَّهَ أَنْ يَجْعَلَنِي مُسْتَجَابَ ا لدَّعْوَةِ، فَقَالَ لَهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَا سَعْدُ أَطِبْ مَطْعَمَكَ تَكُنْ مُسْتَجَابَ الدَّعْوَةِ، وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ، إِنَّ الْعَبْدَ لَيَقْذِفُ اللُّقْمَةَ الْحَرَامَ فِي جَوْفِهِ مَا يُتَقَبَّلُ مِنْهُ عَمَلَ أَرْبَعِينَ يَوْمًا، وَأَيُّمَا عَبْدٍ نَبَتَ لَحْمُهُ مِنَ السُّحْتِ وَالرِّبَا فَالنَّارُ أَوْلَى بِهِ

হযরত ইবনে আব্বাস রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এ আয়াত “হে মানব মন্ডলী, পৃথিবীর হালাল ও পবিত্র বস্তু-সামগ্রী ভক্ষন কর।” [সূরা বাকারা-১৬৮] আয়াতটি তিলাওয়াত করা হল। তখন সাদ বিন আবী ওয়াক্কাস রাঃ দাঁড়ালেন এবং বললেনঃ হে আল্লাহ রাসূল!আপনি আমার জন্য দুআ করুন যেন আল্লাহ আমাকে মুস্তাজাবুদ দাওয়া [দুআ করলে সাথে সাথে কবুল হয় এমন] বানিয়ে দেন। তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে সাদ! তুমি তোমার খাবারকে পবিত্র রাখো,[হালাল ভক্ষণ কর] তুমি মুস্তাজাবুত দাওয়া হয়ে যাবে। যে সত্তার হাতে মুহাম্মদ [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] এর প্রাণ তার কসম! নিশ্চয় কোন বান্দার পেটে যদি হারাম এক লোকমরা খাবারও প্রবেশ করে, তাহলে চল্লিশ দিন পর্যন্ত তার আমল কবুল হয় না। আর ব্যক্তির যে গোস্ত পিন্ড হারাম সম্পদ বা সুদের টাকায় বৃদ্ধি হয়েছে, তার জন্য জাহান্নামই উত্তম। 📖[আলমুজামুল আওসাত, হাদীস নং-৬৪৯৫, আততারগীব ওয়াত তারহীব, হাদীস নং-২৬৬০]

হাদীসটি নিতান্ত জ্বয়িব।।

👉হারাম ভক্ষণকারীর চল্লিশ দিন পর্যন্ত আমল কবুল হয় না অর্থ হল, তার আমলটি আল্লাহর দরবারে ফজিলত,সওয়াবের অধিকারী হয় না, প্রতিটি আমলের আলাদা কিছু ফজিলত আর সাওয়াব থাকে তা থেকে সে বঞ্চিত হবে। কিন্তু আদায় করার দ্বারা উক্ত ব্যক্তি দায়িত্বমুক্ত ঠিকই হয়ে যাবে, তার উপর অর্পিত ফরজ দ্বায়িত্ব আদায় হয়ে যাবে। তাই পরবর্তীতে আর উক্ত আমলকে পুনরায় আদায় করা লাগবে না।

৬.হারাম উপার্জনে দুর্ভিক্ষের পূর্বাভাস।

ওযনে কম দিয়ে হারাম পন্থা অবলম্বন করলে দুর্ভিক্ষের পূর্বাভাস জানিয়ে রাসূল (ছাঃ) বলেন

,خَمْسٌ بِخَمْسٍ: مَا نَقَضَ قَوْمٌ الْعَهْدَ إِلاَّ سَلَّطَ اللهُ عَلَيْهِمْ عَدُوَّهُمْ وَمَا حَكَمُوْا بِغَيْرِ مَا أَنْزَلَ اللهُ إِلاَّ فَشَا فِيْهِمُ الْفَقْرُ وَمَا ظَهَرَتْ فِيْهِمُ الْفَاحِشَةُ إِلاَّ فَشَا فِيْهِمُ الْمَوْتُ (أَوْ إِلاَّ ظَهَرَ فِيْهِمُ الطَّاعُوْنُ) وَلاَ طَفَّفُوا الْمِكْيَالَ إِلاَّ مُنِعُوا النَّبَاتَ وَاُخِذُوْا بِالسِّنِيْنَ، وَلاَ مَنَعُوا الزَّكَاةَ إِلاَّ حُبِسَ عَنْهُمُ الْمَطَرَ،

অর্থাৎ ‘পাঁচটি বস্ত্ত পাঁচটি বস্তুর কারণে হয়ে থাকে। ১. কোন কওম চুক্তিভঙ্গ করলে আল্লাহ তাদের উপরে তাদের শত্রুকে বিজয়ী করে দেন। ২. কেউ আল্লাহর নাযিলকৃত বিধানের বহির্ভূত বিধান দিয়ে দেশ শাসন করলে তাদের মধ্যে দারিদ্র্য ছড়িয়ে পড়ে। ৩. কোন সম্পদ্রায়ের মধ্যে অশ্লীল কাজ বিস্তৃত হ’লে তাদের মধ্যে মৃত্যু অর্থাৎ মহামারি ছড়িয়ে পড়ে। ৪. কেউ মাপে বা ওযনে কম দিলে তাদের জন্য খাদ্যশস্যের উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং দুর্ভিক্ষ তাদের গ্রাস করে। ৫. কেউ যাকাত দেওয়া বন্ধ করলে তাদের থেকে বৃষ্টি বন্ধ করে দেওয়া হয়’।📖[. ছহীহ আত-তারগীব ওয়াত তারহীব হা/৭৬৫; ছহীহুল জামে‘ হা/৩২৪০। ]

৭.হারাম অর্থের কুফল সন্তানের মাঝেও প্রভাব সৃষ্টি করে। কারণ সে খাবার পিতা ভক্ষণ করলে, পিতার শরীরে শুক্রাণু তৈরি হয়। মা খেলে, মায়ের গর্ভে সন্তানের আহার সেই হারাম মাল থেকেই তৈরি হয়। তাই সন্তান বখে যাওয়ার পিছনে অনেক কারণ এর একটি হারাম উপার্জন।

৮.হারাম উপার্জন ব্যভিচার থেকেও মারাত্মক।
🌟সূদের ভয়াবহতা সম্পর্কে রাসূল (ছাঃ) বলেন, دِرْهَمُ رِبَا يَأْكُلُهُ الرَّجُلُ وَهُوَيَعْلَمُ أَشَدُّ مِن سِتَّةِ وَثَلاَثِيْنَ زِيْنَةً.
‘কোন ব্যক্তির জেনে শুনে এক দিরহাম বা একটি মুদ্রা সমপরিমাণ সূদের উপার্জন ভক্ষণ করা ছত্রিশ বার যেনা করার চেয়েও কঠিন (পাপ)’📖।[আহমাদ, হাদীছ ছহীহ, মিশকাত হা/২৮২৫; বাংলা মিশকাত হা/২৭০১।]

🌟আব্দুল্লাহ বিন মাসঊদ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেন,
اَلرِّبَا ثَلَاثَةٌ وَسَبْعُونَ بَابًا أَيْسَرُهَا مِثْلُ أَنْ يَنْكِحَ اَلرَّجُلُ أُمَّهُ وَإِنَّ أَرْبَى اَلرِّبَا عِرْضُ اَلرَّجُلِ اَلْمُسْلِمِ  ‘সূদের তিয়াত্তরটি দরজা (স্তর) রয়েছে। তন্মধ্যে সর্বাপেক্ষা ছোট হচ্ছে, কোন ব্যক্তির তার মায়ের সাথে যেনা করার ন্যায়। আর কোন মুসলিম ভাইয়ের সম্মানের ক্ষতিসাধন করা বড় ধরনের
সূদ’।📖[ইবনু মাজাহ হা/২২৭৫; হাকেম হা/২২৫৯

🌟রাসূল (ছাঃ) সূদদাতা, সূদ গ্রহীতা, এর লেখক ও সাক্ষী সকলের উপর লা‘নত করেছেন। হযরত জাবের (রাঃ) বলেন,
لَعَنَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم آكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ وَقَالَ هُمْ سَوَاءٌ.
‘রাসূল (ছাঃ) সূদ গ্রহীতা, সূদদাতা, সূদ লেখক ও এর সাক্ষীদ্বয়কে লা‘নত করেছেন এবং তিনি বলেন, এরা সকলে সমান (অপরাধী)’।📖[মুসলিম হা/১৫৯৮;)

৯.হারাম উপার্জনের দান আল্লাহ গ্রহণ করেন না :
🌟এক হাদীসে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা দিয়েছেন,
لَا تُقْبَلُ صَلَاةٌ بِغَيْرِ طُهُورٍ وَلَا صَدَقَةٌ مِنْ غُلُولٍ.

ওযু ছাড়া নামায কবুল হয় না; আর আত্মসাতের (অর্থাৎ অবৈধভাবে উপার্জিত) সম্পদের ছদকাও কবুল হয় না। -📖(সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৪; জামে তিরমিযী, হাদীস ১)

১০.সমাজ ও ব্যক্তিজীবনে হারাম উপার্জনের প্রভাব

ব্যক্তি ও সমাজের ওপর হারাম উপার্জনের প্রভাব খুবই মারাত্মক। হারাম উপার্জনের ফলে মানবজীবনের সব ধরনের বরকত ছিনিয়ে নেয়া হয়। রোগ-ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। আর্থিক অনটন-সংকট দেশে-সমাজে শক্তভাবে শিকড় গেড়ে বসে। বেকারত্ব অভিশাপ আকারে প্রকাশিত হয়। জুলুম, অন্যায়, প্রতিহিংসা ও রেষারেষির সয়লাব ঘটে। যারা হারাম খায়, পরিবার-পরিজন, ছেলে-সন্তানদের হারাম অর্থে লালন করে, তারা মারাÍক ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত হয়।

১১.হারাম উপার্জন থেকে অবৈধ কাজ বৃদ্ধি পায়

অবৈধ কাজকর্মের বৃদ্ধি সমাজে তখনই বৃদ্ধি পায়, যখন মানুষ নিজের যোগ্যতার থেকে বেশি পেয়ে যায়। হারাম উপার্জন এই কাজের পিছনে শক্তি যোগায়। যারা হারাম পথে উপার্জন করে, তারা আল্লাহ তাআলার ইবাদতের পথ থেকে সরে এসে বেছে নেয় বিলাস ব্যসনের পথ, ভুলে যায় সমস্ত ইসলাম ও দ্বিনের কর্তব্য। বিশাল প্রাসাদোপম অট্টালিকা, মদ, বেশ্যাগমন ইত্যাদি সমস্ত অবৈধ কাজই এদের থেকে সমাজে ছড়িয়ে পরে।

১২.অপব্যয়ের পথে নিয়ে যায় হারাম উপার্জন

হারামের পথে অর্থ উপার্জন হয়ে যায় সহজলভ্য, ফলে উপার্জনকারীর সেই সম্পদ দুহাতে খরচ করে। তাদের জীবনধারণে কোনোরকম নিরাপত্তা বা স্থিরতা। এই ধরনের জীবনযাপন যেকোনো সমাজের ক্ষেত্রেই ক্ষতিকর। হারাম উপার্জনকারীরা নিজেদের দায়দায়িত্ব পালনে অপারগ হয়, এবং অনেক্ষেত্রেই বদমেজাজি, দুর্ব্যবহারকারী হয়। ঠিক যেমন কৃপণতা একটি খারাপ অভ্যাস, অত্যাধিক ভয়ও সেরকমই ক্ষতিকারক অভ্যাস।

এই ভয়াবহতা থেকে বাঁচার উপায়।

ইসলামের অমোঘ বিধান তো হল, কেউ হারাম পথে সম্পদ উপার্জন করবে না। কিন্তু এরপরেও যদি কেউ শয়তানের ধোঁকায় অন্যায় পথে সম্পদ উপার্জন করে ফেলে অথবা কোনোভাবে যদি হারাম সম্পদ কারো কাছে জমা হয়ে যায়। তাহলে তার জন্য এই পাপ থেকে তওবা করা আবশ্যক। আর আল্লাহ তাআলা তাওবাকারীকে মাফ করে দেন।

إِنَّمَا التَّوْبَةُ عَلَى اللَّهِ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السُّوءَ بِجَهَالَةٍ ثُمَّ يَتُوبُونَ مِنْ قَرِيبٍ فَأُولَٰئِكَ يَتُوبُ اللَّهُ عَلَيْهِمْ ۗ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمًا [٤:١٧] وَلَيْسَتِ التَّوْبَةُ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السَّيِّئَاتِ حَتَّىٰ إِذَا حَضَرَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ إِنِّي تُبْتُ الْآنَ وَلَا الَّذِينَ يَمُوتُونَ وَهُمْ كُفَّارٌ ۚ أُولَٰئِكَ أَعْتَدْنَا لَهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا [٤:١٨

অবশ্যই আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করবেন,যারা ভূলবশতঃ মন্দ কাজ করে,অতঃপর অনতিবিলম্বে তওবা করে; এরাই হল সেসব লোক যাদেরকে আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। আল্লাহ মহাজ্ঞানী,রহস্যবিদ। আর এমন লোকদের জন্য কোন ক্ষমা নেই, যারা মন্দ কাজ করতেই থাকে,এমন কি যখন তাদের কারো মাথার উপর মৃত্যু উপস্থিত হয়,তখন বলতে থাকেঃ আমি এখন তওবা করছি। আর তওবা নেই তাদের জন্য, যারা কুফরী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। আমি তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছি।📖 {সূরা নিসা-১৭-১৮}

হযরত উবাদা বিন আব্দুল্লাহ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন,রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ

التَّائِبُ مِنَ الذَّنْبِ، كَمَنْ لَا ذَنْبَ لَهُ

গোনাহ থেকে তওবাকারী এমন,যেন সে গোনাহ করেইনি। 📖[সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-৪২৫০]

এক্ষেত্রে তওবার অপরিহার্য একটি শর্ত হল,যার হক নষ্ট হয়েছে তার হক যথাযথভাবে আদায় করে দেওয়া। এ অবস্থায় তওবাকারীর সামনে স্বাভাবিকভাবে কয়েকটি ছুরত  আসে।

☑️এক. তওবাকারী নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির হক নষ্ট করেছে। এক্ষেত্রে সে যেভাবেই হোক পাওনাদারের হক তার কাছেই পৌঁছে দেবে। বিখ্যাত তাবেঈ হযরত হাসান বসরী রাহ. বলেন,

مَنِ احْتَازَ مِنْ رَجُلٍ مَالاً، أَوْ سَرَقَ مِنْ رَجُلٍ مَالاً، وَأَرَادَ أَنْ يَرُدّهُ إلَيْهِ مِنْ وَجْهٍ لاَ يَعْلَمُ فَأَوْصَلَهُ إلَيْهِ : فَلا بَأْسَ.

যে ব্যক্তি কারো কোনো সম্পদ (অন্যায়ভাবে) কুক্ষিগত করল, অথবা কারো থেকে কোনো কিছু চুরি করল অতপর এমন পদ্ধতিতে সেই সম্পদ তার  কাছে পৌঁছে দিতে চাইল যাতে সে জানতে না পারে; তাহলে সে তা করতে পারবে। -📖(মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হাদীস ২৩৫৯৬)

☑️দুই. সুনির্দিষ্টভাবে কারো হক নষ্ট করেনি বরং জনগণের সম্মিলিত হক নষ্ট করেছে। তাহলে আল্লামা ইবনুল জাওযী রাহ.-এর ভাষ্যমতে যেই খাত থেকে অন্যায়ভাবে নিয়েছে সেখানেই হক পৌঁছে দেবে। যেমন: রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে নিয়ে থাকলে সেখানে পৌঁছে দেবে। এই সম্পদ গরিবদের মাঝে সদকা করলে হবে না। -📖(জামিউল উলূমি ওয়াল হিকাম, পৃ: ২৬৬)

☑️তিন. কারো হক নষ্ট করা ছাড়া শরীয়ত কর্তৃক হারাম পন্থায় উপার্জিত সম্পদের মালিক হয়েছে। যেমন: শূকর, মদ ইত্যাদি বিক্রয় করা সম্পদ। জুয়ার মাধ্যমে উপার্জিত সম্পদ। শরীয়তের  অনুনোমোদিত পন্থায় ক্রয়কৃত সম্পদ। এক্ষেত্রে বিধান হল, ঐ সম্পদ সওয়াবের নিয়ত ব্যতীত সদকা করে দেবে।

☑️চার. তওবাকারী কার থেকে বা কোন্ খাত থেকে নিয়েছে তা জানে না। তার পক্ষে জানা সম্ভবও নয়। তাহলে পূর্বের ছুরতের ন্যায় এক্ষেত্রেও সওয়াবের নিয়ত ব্যতীত সদকা করে দেবে।

✨এক ব্যক্তি বিশিষ্ট তাবেঈ হযরত আতা রাহ.-কে জিজ্ঞাসা করেন, আমি যখন অল্প বয়স্ক ছিলাম তখন এমন পন্থায় মাল উপার্জন করতাম, যা আমি এখন পছন্দ করি না (অর্থাৎ অবৈধ পন্থায়)। আমি তওবা করতে চাই। তখন তিনি তাকে বললেন,

رُدّهَا إلَى أَهْلِهَا ، قَالَ : لاَ أَعْرِفُهُمْ، قَالَ : تَصَدّقْ بِهَا، فَمَا لَكَ فِي ذَلِكَ مِنْ أَجْرٍ، وَمَا أَدْرِي هَلْ تَسْلَمُ مِنْ وِزْرِهَا أَمْ لاَ ؟

তুমি এ মাল তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দাও। সে বলল, আমি তো এখন তাদের সম্পর্কে কিছুই জানি না। তিনি বললেন, তাহলে তা সদকা করে দাও। এতে তোমার কোনো সওয়াব হবে না। তুমি এর গোনাহ থেকে মুক্তি পাবে কি না তাও বলতে পারব না। -📖(মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হাদীস ২৩৫৯৪)

হযরত মুজাহিদ রাহ. থেকেও অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ হারাম মাল সওয়াবের নিয়ত ব্যতীত সদকা করে দিবে। তবে এই সদকার বিধান তখনই প্রযোজ্য যখন হকদারের কাছে তা পৌঁছানো সম্ভব হবে না। নতুবা আসল বিধান হল পাওনা তার হকদারকে পৌঁছে দেওয়া।

🤲আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে লেনদেনে পরিচ্ছন্ন হওয়ার এবং বান্দার হকের বিষয়ে সচেতন হওয়ার তাওফীক দান করুন। হালাল উপার্জনে বরকত দান করুন, হারাম থেকে রক্ষা করুন।

মুফতী মাহমুদ হাসান
*দারুল হাদীস (এম.এ,ইসলামিক স্টাডিস)
জামিয়াতুল আবরার বসুন্ধরা ঢাকা।
*দারুল ইফতা (ইসলামিক আইন ও গবেষণা বিভাগ) ঢাকা।
*আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ(অনার্স) ঢাকা।
মোবাইল: 01751357580

নিউজটি শেয়ার করুন


এ জাতীয় আরো খবর..