শনিবার, ০১ অক্টোবর ২০২২, ০৭:১৬ পূর্বাহ্ন

অর্থপাচার : বিএফআইইউকে ‘গবেষণা সেল’ করতে বললেন হাইকোর্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩১ আগস্ট, ২০২২

কার্যবকর অর্থপাচার প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে (বিএফআইইউ)একটি ‘গবেষণা সেল’ গঠন করতে বলেছেন হাইকোর্ট। সেই সঙ্গে এগমন্ট গ্রপ্রের সদস্য হিসেবে বিএফআইইউ কোন কোন দেশের কাছে অর্থপাচার ও পাচারকারীদের তথ্য চেয়েছে, কী তথ্য পেয়েছে, তথ্য পেয়ে থাকলে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে এবং পাচার করা অর্থ উদ্ধারে কী পদক্ষেপ নিয়েছে, এসব বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন চেয়েছেন আদালত।

আগামী ২৬ অক্টোবর পর্ববর্তী আদেশের জন্য রেখে বিএফআইইউ’র প্রধান মো. মাসুদ বিশ্বাসকে এ প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
মাসুদ বিশ্বাসের উপস্থিতিতে বুধবার বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি খিজির হায়াতের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

এগমন্ট গ্রুপ হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (এফআইইউ) সমন্বয়ে গঠিত একটি আন্তর্জাতিক ফোরাম, যারা অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে কাজ করে। বিশ্বের প্রায় দেড়শটি দেশের এফআইইউ এগমন্টের সদস্য।

সুইস ব্যাংকে অর্থ জমাকারী বাংলাদেশিদের বিষয়ে সুইস সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য চায়নি বাংলাদেশ সরকার। গত ১০ অগাস্ট রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নে সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত একথা বলেন। তার বক্তব্য উদ্বৃত করে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রকাশিত খবর নজরে এলে ১১ অগাস্ট স্বপ্রণোদিত হয়ে সরকার ও দুদকের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছিলেন আদালত। তার এমন বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএফআইইউর পক্ষ থেকে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। কিন্তু বিএফআইইউ’র অর্থপাচার সংক্রান্ত তথ্যের প্রতিবেদন যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে আদালতে দাখিল করায় মঙ্গলবার বিএফআইইউ প্রধান মো. মাসুদ বিশ্বাসকে তলব করেন হাইকোর্ট। বুধবার বেলা ১১টায় আদালতে হাজির হয়ে তাকে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়। আদেশ অনুযায়ী আদালতে হাজির হয়ে মাসুদ বিশ্বাস আদালতের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, অসাবধানতাবশত এমনটি হয়েছে। আদালতে খসড়া প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়েছে। আজ যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রতিবেদন দাখিল করেছি। এমন ভুলের যাতে পুনরাবৃত্তি না হয় সে জন্য অঙ্গীকার করছি।

এসময় বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক বলেন, আদালতে আদেশ বাস্তবায়ন প্রতিবেদন পাঠানোর ক্ষেত্রে আরও সতর্কতার সাথে পাঠানো উচিত। এটা সচেতনভাবে অন্যায়। এর থেকে আমাদের সবারই বেরিয়ে আসা উচিত। এসময় বিএফইউ প্রধান মাসুধ বিশ্বাস ক্ষমা চাইলে আদালত এ কর্মকর্তাকে সতর্ক করে বলেন, ঠিক আছে ক্ষমা করলাম। ভবিষ্যতে এমন হলে কঠোর পদক্ষেপ নিবো।
বিএফআইইউ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিভিন্ন দেশের এফআইইউ ও এগমন্ট গ্রুপের কাছে ৬৭ জনের বিষয়ে তথ্য চেয়েছে। আদালত এ প্রতিবেদন দেখে বিএফআইইউ প্রধানের কাছে জানতে চান ৬৭ জনের নাম কিভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। জবাবে মাসুদ বিশ্বাস বলেন, মিডিয়িা এবং অন্যান্য অ্যাজেন্সি আমরা তথ্য সংগ্রগ করেছি।

তখন আদালত বলেন, আপনার কাছে তো নির্ভুল তথ্য নাই। অনুমানের ভিত্তিতে আদালতে তথ্য দেওয়া যাবে না। আমাদের মনে হয়েছে ৬৭ জনের নাম অনুমানের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছে।
মাসুদ বিশ্বাস ফের বলেন, বিভিন্ন ডেটা বিশ্লেষণ করে এই নামগুলো আমরা পেয়েছি।
অর্থ পাচারকারীদের নাম এবং টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য বিএফআইইউ কোনো দেশের সাথে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি বা যোগাযোগ করেছে কিনা, আদালতের এ প্রশ্নে কোনো জবাব দেননি মাসুদ বিশ্বাস।

অর্থপাচার প্রতিরোধ সংক্রান্ত ভারতের ‘রামজিৎ মালানি বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া’ মামলার রায় পড়ার পরামর্শ দিয়ে বিএফআইইউ প্রধানের উদ্দেশ্যে আদালত বলেন, কেবল চিঠি দেওয়াই (বিভিন্ন দেশের এফআইইউকে) যথেষ্ট নয়। আইনের মধ্যে যথাযথ প্রক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ না করলে ৫০ বছরেও পারবেন (অর্থপাচার ও পাচারকারীদের তথ্য) না।
তখন মাসুদ বিশ্বাস বিএফআইইউ’র কার্যথক্রম তুলে ধরে বলেন, ২০১৭ থেকে চলতি বছরের জুন পর্য৫ন্ত দুদক, এনবিআর এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে এ পর্য২ন্ত আমরা ৯৮৩টি ইন্টিলিজেন্স প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। এসব প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে এ পর্যযন্ত কতটি মামলা হয়েছে জানতে চাইলে আদালতে সে প্রশ্নের উত্তরও দিতে পারেননি বিএফআইইউ প্রধান। এসময় বিচারক আদালত বলেন, খালি চিঠি চালাচালি করলে হবে না। মনিটরিং করতে হবে। কাজ কিছু করেন। আমাদের দেখান। যেকোনো উপায়ে অর্থ পাচার কমাতে হবে।

মাসুদ বিশ্বাস বলেন, বিভিন্ন দেশে তথ্য চেয়ে ৬৪৪ টি অনুরোধ আমরা পাঠিয়েছি। আর ১২৮টি অনুরোধ আমরা পেয়েছি। ৭৯ বার এফআইইউ টু এফআইইউ যোগাযোগ হয়েছে।

তখন আদালত এফআইইউ টু এফআইইউ চুক্তি হওয়া উচিত বলে অভিমত দিয়ে বলেন, ভারত দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করে ৭৮৪ জনের টাকা ফেরত এনছে। ভারত পারলে আমরা কেন পারবো না?কিী পদক্ষেপ নিচ্ছেন আমাদের জানান। গবেষণা সেল তৈরি করেন। সেল তৈরি করে আমাদের জানান। দেশের স্বার্থে আপনাকে ডেকেছি। আমরা যা করি দেশ-জনগণের কল্যাণে করছি। আমরা (আদালত) যতটুকু পারি আদেশ, রায়ের মাধ্যমে আইনগত সহায়তা দিব।

এরপর ২৬ অক্টোবর পরবর্তী আদেশের জন্য রেখে এ সময়ের মধ্যে মাসুদ বিশ্বাসকে প্রতিবেদন দিতে বলেন হাইকোর্ট।
এসময় আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ কে এম আমিন উদ্দিন মানিক। দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত আজকের অর্থনীতি ২০১৯।

কারিগরি সহযোগিতায়: