রবিবার, ০১ অগাস্ট ২০২১, ০৮:০৫ অপরাহ্ন

“আমার ছোটবেলা ও আমার গাঁ”— খান লিটন

অর্থনীতি ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার ৫ জুলাই, ২০২১
  • ৫৭ বার পঠিত

আপনি যদি বাংলাদেশের ভেনিস বরিশাল পর্যন্ত যে কোন পথে যান। সেখান থেকে আপনাকে আমি সরিষামুরী নিয়ে যাবো। বরিশাল থেকে তিনটি খরস্রোতা নদী , আগুনমূখা, পায়রা, বিশখালী একেঁবেকেঁ বঙ্গোসাগরে প্রবাহিত হয়। স্বাভাবিক ভাঁটার গতিতে সাগরকে তার জলের শোধ দিলেও সাগর মাঝে মধ্যে তেড়ে আসে তার জলরাশি নিয়ে। ভাসিয়ে নেয় উপকূলবাসীকে । এক সময় কাঠের দোতালা (ঢাকা থেকে আসা), দেড়তালা বা একতালা লঞ্চ ছিলো এই ভাঁটির জনপদের চলাচলের বাহন ও নৌকা । আজকাল ইটের পিচঢালা পথে কিংবা হেলিকপ্টারেও যাওয়া যায়।

ফুলঝুরি হলো লঞ্চঘাট । হ্যাঁ, সরিষামুরী সত্যিকারের সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা একটি গ্রাম । যার পাশ দিয়ে বয়ে যায় অবিরত বিশখালী নদী । বরগুনা জেলার ( সাবেক মহকুমা ) বেতাগী উপজেলা বা থানার ৭ নং ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড । এখানে আমি অর্ধশতাধ্বীর একটু বেশী সময় আগে মরহুম জনাব আলী খাঁ(হজরত আলী খান )মরহুমা জনাবা জরী (জরিনা আলী খান )এর দোতালা টিনের নাক বারান্দা দেয়া ঘরে এসেছিলাম এই ধরনীতে । ছিলো গোলাভরা ধান , পুকুর ভরা মাছ, গোয়ালভরা গরু, হাসঁমুরগীর সমাহার। ছিলো মমতাময় জীবন । সব ভাইবোনদের পরে আগমনে , বড় ভাইবোনদের স্নেহে বড় হয়েছি , বোনরা নাকি ছোট বেলায় ওড়নায় জড়িয়ে মক্তবে নিয়ে যেত। এই গ্রামে বড় হয়েছি , বাবা চাচার জমিতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কৃঞ স্যার ( পরলোকগত) এর কাছে তাল পাতায় ও পরে সিলেট প্যান্সিল দিয়ে বর্নমালা শিখেছি। ফুলঝুরী বাজারে গিয়ে বারৈর দোকান থেকে বাতাসা, সন্দেশ ও জিলাপী নিয়ে আসতাম , ছোটদের কাছে টাকা চাইতো না। ঝড়ে সেই স্কুল প্রায়ই উড়ে যেতে দেখেছি , যা আজ তিনতলা ইটের ইমারত । এইখানে মনু(ব্যাবসায়ী),পান্না(অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা ),জাহাংগীর ( বরিশাল দপদপিয়া খেয়া ঘাঁটের মাঝি ) গ্রামের দুস্ট ছেলেদের সাথে মেশা নিষেধ থাকা সত্বেও পালিয়ে গ্রাম্যখেলা খেলেছি। যেমন , ডাংগুলী, হাডুডু, ছোঁয়াছুই, মার্বেল, অকারনে ডুবাডুবি ( সাঁতার), ফুটবল না থাকার কারনে ছোলম ( জাম্বুরা ) দিয়ে ফুটবল ।

দুপুরের খাবার পর বাবা ও মেঝোভাই ঘুমালে —— যখন আওয়াজ শুনতাম অন্যদের —“ হাতে লড়ি পায়ে লড়ি এসো সবে খেলা করি “। পালিয়ে জড়ো হতাম সবাই । একবার বাঁশের সাঁকোর উপর বসে পয় করতে গিয়ে খালে পড়ে গিয়েছিলাম , তখন সাঁতার জানতাম না। ভাগ্নে কাম বন্ধু মনু টেনে তুলেছিলো । পরে বাবা পুকুরে সাঁতার শিখেয়ে ছিলেন নিজে ও ঝুন নারিকেল ( পাঁকা ) ও কলা গাছ দিয়ে । জোৎস্না রাতে নিজেদের নারিকেল বা রস চুড়ি করে রাতে পায়েশ বা শিন্নি খাওয়ার মজাই ছিলো আলাদা । বড় ভাই মরহুম এম, এ সাত্তার খান ছুটিতে গ্রামে এলে নতুন জামা , ইংলিশ প্যান্ট পড়া ,বাটার জুতা যা নারিকেল তেল দিয়ে রোদে শুকাতাম ও নতুন কচকচা একটাকা পাওয়ার মজাই ছিলো অন্যরকম ।
গেদা মাঝির এক মালাই নৌকায় ভাঁটা জোয়ারের সাথে তাল রেখে , অনেক সময় পাল তুলে চৌদ্দবত্তনিয়া মামু বাড়ী ও গুলিশাখালী বোনের বাডী যাওয়া ছিলো আকর্ষনীয় । আমাদের ছোট বেলায় পকেট খরচ দেয়ার নিয়ম ছিলো না । তাই নিজেদের সুপারি পান্নার সহযোগীতায় চুরি করে বিক্রি করে পকেট খরচ চালাতাম বা ইউনুচ মামু ( কাজের সহযোগী) বা মেঝোভাবী, বড় ভাবীর সহযোগীতায় ধান/চাল নিয়ে বিক্রি করে । মাঝে মধ্যে আনু বুজি ( বোন) চিঠির মধ্যে দশ/বিশ টাকা পাঠাতো । এই গ্রামে ঝাঁকি জাল দিয়ে নদীতে বা কোলায় ( বৃষ্টির সময় মাঠে) চড়া দিয়ে ( আগে মাটি ও চালের ভুষি মিশিয়ে ) মাছ ধরেছি । অমূল্য মা কাকিরে ধান দিয়ে মুডি বা মোয়া খেয়েছি । এখানে বাবা ও মেঝোভাইকে তরমুজ ও আখ ক্ষেত দিয়ে পাইকারী ( ফইরার নাও )বেঁচতে দেখেছি ।

শীতে ওয়াজ মাহফিল হলেও যুবকরা নাটকও করেছে । এখানে দেখেছি হাঁটু সমান কাঁদার রাস্তায় হাঁডিপাতিল বিক্রিওয়ালাদের আওয়াজ ও অগ্রহায়ণে নবান্নের আমেজে ব্যাবাইজ্জার ( বাইদানী বা সাপুরে ) আওয়াজ —“ শিংগা লইবেন ? শিংগা লইবেন “? নির্মল ও আজিজ পেয়াদা ( আমার চাচাতো দুলাভাই) মন ভূলানো বাঁশের বাশি বাজাতো রাতে ।এখানে দেখেছি , অন্তা , অনন্ত কুমার শীল ( পারিবারিক নাপিত ) মাসে একবার এসে তার পূর্বপ“রুষের দাঁতবিহীন মেশিন দিয়ে হাঁটুর নিচে আমাদের ঘাড় চেঁপে ধরে মাসে একবার চুল কেটে দিতেন । মেশিন পুরানো হওয়ার কারনে ঘাড় জ্বলার পাশাপাশি বিরক্তিকর ছিলো আÍ শীলের ধুতির ফাঁক দিয়ে তার অন্ডকোষটা আমাদের পিঠে লাগা।

হাঁটের দিন বুধবার ও রবিবার মায়ের বেশী ব্যস্ততা , বার বার পুকুর পাড়ে গিয়ে রাস্তায় তাকানো , তার ভাই আজিজ হাওলাদার বা ছোট মামু শাহেদ হাওলাদার আসতে পারে তাই । গ্রামে ছোট বড় সমস্যা প্রায়ই গ্রামের বাংঙা ভাই বা খাঁ সাব ও বাংঙা ভাউজ ( আমার মা ) মিটিয়ে দিতেন । আমার পূরো মনে নেই, শুনেছি , মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাবার হিন্দু বন্ধুরা আমাদের বাড়ীতে আশ্রয় নিয়েছিলেন । দেখেছি ঈদে তারা আমাদের বাড়ীতে বেড়াতে এসেছে। আমরা পূঁজোঁয় তাদের বাড়ীতে গিয়েছি । অনেকে সন্ধ্যা বেলা পুঁথি পড়তো, আমার মেঝোভাই মরহুম জয়নাল আবেদিন খানও পড়তেন । আরো হাজারো ঘটনা , হাজারো কথা । আজ অনেক কিছুই নাই, চির নিদ্রায় শুয়ে আছেন আমার পূর্বপুরুষরা , মা, বাবাসহ বড় ভাই, মেঝোভাই এই সরিষামুরী গ্রামে।

লেখক:
খান লিটন
জামার্ন প্রবাসী

নিউজটি শেয়ার করুন


এ জাতীয় আরো খবর..