বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২০, ০২:১৪ পূর্বাহ্ন

ঈদের নামাজের মাসআলা

মুফতী মাহমুদ হাসান
  • আপডেট টাইম : ৩১ জুলাই, ২০২০
  • ১০৩ বার পঠিত

ঈদের নামাজ একটি গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব ইবাদত।ঈদের নামাজের মাধ্যমে আমরা মহান আল্লাহ তায়ালার কৃতজ্ঞতা ও আনন্দ উজ্জাপন করি। প্রতিটি আমল এবং ইবাদতের কিছু নিয়ম/বিধিমালা রয়েছে। ঈদের নামাজেরও কিছু শরীয়ী দিক নির্দেশনা রয়েছে। আমার এই প্রবন্ধে তা উপস্থাপনের প্রয়াস পাব।ইনশাআল্লাহ।

📚ঈদের নামাযে বিধানঃ

✒দ্বিতীয় হিজরীতে ঈদের নামায ওয়াজিব হয়। বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, ঈদের নামায পড়ার বিধান নাযিল হওয়ার পর থেকে রাসূল (স.) মৃত্যু পর্যন্ত কোন বছরই কোন ঈদের নামায পড়া বাদ দেননি। তেমনি খুলাফায়ে রাশিদীনের কেউ তা বাদ দেননি। এর দ্বারা ঈদের নামায ওয়াজিব হওয়া প্রমাণিত হয়। ইচ্ছাকৃতভাবে বর্জন করলে গুনাহাগার হবে।
ঈদের নামায দুই রাকাত।📖 -সহিহ বোখারি: হাদিস নং ১৩৪১

📚ঈদের নামাজের সময়ঃ

✒চোখের দেখায় সূর্য দিগন্ত থেকে আনুমানিক দুই মিটার উচ্চতায় পৌঁছালে ঈদের নামাজ পড়া হয়। জোহর নামাজের আগেই ঈদের নামাজ আদায় করতে হয়। সুন্নাত হিসেবে ঈদুল ফিতরের নামাজ কিছুটা দেরী করে এবং ইদুল আজহার নামাজ দ্রুত আদায় করা হয়। ইদুল ফিতরে ফিতরা প্রদান করতে হয়। ঈদ সকালে কিছুটা সময় পাওয়া গেলে ফিতরা আদায়ে সুবিধা হবে। অন্যদিকে ঈদুল আজহায় ঈদের নামাজ সম্পন্ন করে আল্লাহর উদ্দেশ্যে পশু কুরবানী করা হয়। সেজন্য ঈদের নামাজ যত দ্রুত সম্ভব আদায় করতে হবে। এই ব্যাপারে হাদিসে সুস্পষ্ট বিধান প্রদত্ব রয়েছে

📚ঈদের নামাজ কোথায় পড়বে?
✒ঈদের নামায ঈদগাহে পড়া সুন্নত। ঈদগাহে পড়ার সুব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও বিনা ওজরে মসজিদে পড়া মাকরূহ। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের নামায ঈদগাহেই পড়তেন। আবু সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার নামায পড়ার জন্য ঈদগাহে গমন করতেন।📖📖 (সহীহ বুখারী, হাদীস : ৯৫৬)

✒✔অবশ্য বৃষ্টির কারণে বা অন্য কোনো ওযরে যেমন জায়গা সংকুলান না হওয়া বা ঈদগাহ না থাকার কারণে মসজিদে ঈদের জামাত করা মাকরূহ নয়। হাদীস শরীফে এসেছে, আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার ঈদের দিন বৃষ্টি শুরু হল, তখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে নিয়ে মসজিদে ঈদের নামায পড়েছেন।
-📖📖সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ১১৬০; ফাতহুল বারী ২/৫২২; রদ্দুল মুহতার ২/১৬৯; ফাতাওয়া বাযযাযিয়া ৪/৭৭; উমদাতুল কারী ৬/২৮২; আলমাদখাল, ইবনুল হাজ্ব ২/২৮৯

📚ঈদের নামাজের নিয়মঃ
✒ঈদের নামায দুই রাকাত। 📖📖-সহিহ বোখারি: হাদিস নং ১৩৪১

✒ঈদের নামাজে আজান ও একামত নেই। হজরত জাবের ইবনে সামুরা (রা.) বলেন, ‘হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে এক বার নয় দুই বার নয়; একাধিক বার ঈদের নামাজ পড়েছি তাতে আজান ও একামত ছিল না।’ 📖📖-সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১৪৭০

✒✔প্রথমে মুখে বা মনে মনে নিয়ত করে নেবে, ঈদুল-ফিতর এর দু’রাকাত ওয়াজিব নামাজ অতিরিক্ত ছয় তাকবীরসহ ইমামের সঙ্গে পড়ছি। তাপর ‘আল্লাহু আকবার’ বলে হাত বেঁধে নেবে এবং সানা পড়বে। তারপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় তাকবীরে কান পর্যন্ত হাত উঠিয়ে ছেড়ে দেবে এবং চতুর্থ তাকবীরে হাত উঠিয়ে বেঁধে নেবে। তারপর স্বাভাবিক নিয়মে প্রথম রাকাত শেষ করবে।
দ্বিতীয় রাকাতে ফাতিহা ও সূরা পাঠ শেষে ইমাম যখন তাকবীর বলবেন, তার সঙ্গে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় তাকবীরে হাত কান পর্যন্ত উঠাতে হবে এবং ছেড়ে দিতে হবে। আর চতুর্থবার তাকবীর বলে হাত না উঠিয়ে সোজা রুকুতে চলে যেতে হবে। বাকিটুকু যথা নিয়মে শেষ করে খুতবা শুনে, দোয়া-মুনাজাত করে বাসা-বাড়িতে ফিরে যেতে হবে।

. ✒ঈদের নামাজের সালাম ফেরানোর পর মোনাজাত করা মোস্তাহাব। ঈদের খুতবার পরে মোনাজাত করা মোস্তাহাব নয়। 📖📖-মুসনাদে আহমদ: ২২১৮

📚ঈদের নামাজে কেরাআতঃ

✒ঈদের নামাজে কেরাআত সম্পর্কে প্রখ্যাত সাহাবি নোমান ইবনে বশির (রা.) হতে বর্ণিত এক হাদিসে দেখা যায়, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) দুই ঈদ ও জুমার নামাজে প্রথম রাকাতে ‘সাব্বিহিসমা রাব্বিকাল আলা’ এবং দ্বিতীয় রাকাতে ‘হাল আতাকা হাদিসুল গাশিয়াহ’ পাঠ করতেন।📖📖 -সুনানে নাসাঈ: হাদিস নং ১৫৫০

✒সূরা ক্বাফ এবং সূরা ইক্বতারাবতিস্ সায়া পড়ার কথাও হাদিসে পাওয়া যায়। 📖-সুনানে নাসাঈ: হাদিস নং ১৫৪৯

📚ঈদের নামাজের পূর্বে নফলঃ

✒ব্যক্তির কথাটি ঠিক নয়। ঈদের নামাযের আগে ঈদগাহে এবং অন্যত্রও নফল নামায পড়া মাকরূহ। তবে ঈদের নামাযের পর ঈদগাহের বাইরে নফল নামায পড়া যাবে।

✒✒আবু সাইদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের নামাযের আগে কোনো নফল নামায পড়তেন না। ঈদের পর বাড়িতে ফিরে এসে দুই রাকাত নামায পড়তেন।
📖📖-সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস : ১২৯৩; আলবাহরুর রায়েক ২/১৬০; রদ্দুল মুহতার ২/১৬৯; শরহুল মুনইয়াহ ২৪৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/৫৩

📚ঈদের নামাজের  কিছু অংশ  ছুটে গেলেঃ

✔ক) ইমাম সাহেবকে প্রথম রাকাতে কিরাত অবস্থায় পাওয়া গেলে তখন কী
করবে?

✔খ) আর এক রাকাত ছুটে গেলে তা পরবর্তীতে কোন নিয়মে আদায় করবে?

✔গ) ইমাম সাহেবকে তাশাহহুদে পাওয়া গেলে সেক্ষেত্রে ঈদের নামায পেয়েছে বলে ধর্তব্য হবে কি? হলে এক্ষেত্রে সালামের পর দু রাকাত কীভাবে আদায় করবে?
উত্তর

✔ক) ঈদের নামাযে প্রথম রাকাতের কিরাত অবস্থায় শরিক হলে তাকবীরে তাহরীমার পর নিজে নিজে অতিরিক্ত তিন তাকবীর বলবে। অতপর বাকি নামায যথানিয়মে ইমামের সাথে আদায় করবে।

✔খ)আর ঈদের নামাযের এক রাকাত ছুটে গেলে ইমামের সালামের পর দাঁড়িয়ে আগে সূরা-কিরাত পড়বে এরপর রুকুর আগে অতিরিক্ত তিন তাকবীর বলবে।

✔গ)আর কোনো ব্যক্তি ইমামের তাশাহহুদ অবস্থায় জামাতে শরিক হলে তার নামাযও সহীহ হবে। এক্ষেত্রে ইমাম সাহেবের সালামের পর দাঁড়িয়ে স্বাভাবিক নিয়মেই দুই রাকাত নামায পড়বে। অর্থাৎ প্রথম রাকাতের শুরুতেই অতিরিক্ত তাকবীরগুলো বলে নিবে। অতপর সূরা-কিরাত পড়বে। আর দ্বিতীয় রাকাতে কিরাতের পর রুকুর আগে অতিরিক্ত তাকবীরগুলো বলবে। 📖-ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ২/৬১৯; আলমুহীতুল বুরহানী ২/৪৯২; কিতাবুল আছল ১/৩২২; ফাতহুল কাদীর ২/৪৬৷

✒যদি কেউ প্রথম রাকাতে রুকুর পূর্বে জামাতে শরিক হয় এবং তাকবিরে তাহরিমার পর দাঁড়ানো অবস্থায় হাত তুলে অতিরিক্ত তিন তাকবির বলার সুযোগ না পায় তাহলে রুকুতে গিয় অতিরিক্ত তিন তাকবির বলবে। তবে সেক্ষেত্রে কান পর্যন্ত হাত উঠাবে না। 📖-আদ্দররুল মুখতার: ১/২৭৪

✒ যদি ইমাম অতিরিক্ত তাকবিরসমূহ ভুলবশতঃ না বলে, আর ঈদের জামাত অনেক বড় হয়, তাহলে ফেতনা ফাসাদের আশংকায় সিজদায়ে সাহু ওয়াজিব হয় না। সুতরাং সিজদায়ে সাহু করবে না। আর যদি এমন হয় যে উপস্থিত সকলেই সিজদায়ে সাহু সম্পর্কে অবগত হতে পারে তাহলে সিজদায়ে সাহু ওয়াজিব হবে। 📖-আদ্দুররুল মুখতার: ২/৯২

✒ ঈদের দ্বিতীয় রাকাতের রুকুর তাকবির ওয়াজিব। যদি কোনো ব্যক্তি দ্বিতীয় রাকাতের রুকুতে শরিক হয় তাহলে সে প্রথমে দাঁড়িয়ে তাকবিরে তাহরিমা বলবে। অতঃপর দাঁড়ানো অবস্থায় হাত তুলে অতিরিক্ত তিন তাকবির বলবে। এরপর রুকুর তাকবির বলে রুকুতে শামিল হবে। 📖-আদ্দুররুল মুখতার: ২/১৭৪

📚📚📚খুতবার মাসয়ালাঃ

✒ সর্বপ্রথম ঈদের নামাজ হবে তারপর খুতবা। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বর্ণনা করেন, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিন ঈদের মাঠে গিয়ে সর্বপ্রথম নামাজ আদায় করতেন তারপর জনগণের দিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে ওয়াজ করতেন, কোনো উপদেশ থাকলে উপদেশ দিতেন বা কোনো নির্দেশ থাকলে নির্দেশ দিতেন। আর জনগণ নামাজের কাতারে বসে থাকতেন। কোথাও কোনো বাহিনী প্রেরণের ইচ্ছা থাকলে তার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতেন অথবা অন্য কোনো নির্দেশ জারি করার ইচ্ছা করলে তা জারি করতেন। 📖-সহিহ বোখারি: হাদিস নং ৯০৩

✒খুতবা চলাকালীন চুপ থেকে খুতবা শ্রবণ করা ওয়াজিব। এ সময় সকল প্রকার কথাবার্তা ও কাজকর্ম নাজায়েয। এমনকি যিকির-আযকার, তাসবিহ-তাহলীল পড়াও নিষিদ্ধ। হাদীস শরীফে আছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ইমামের খুতবার সময় তুমি যদি (কাউকে) বল, চুপ কর, তাহলে তুমি অনর্থক কাজ করলে। 📖(সহীহ বুখারী ১/১২৭; আবু দাউদ, হাদীস নং ১১০৫)

✒ইবনে জুরাইজ রা. থেকে বর্ণিত একটি রেওয়ায়েতে আছে, তিনি বলেন, আমি আতা রাহ. কে জিজ্ঞাসা করলাম, আরাফার দিন অথবা ঈদুল ফিতরের দিন ইমাম যখন খুতবা দেয় তখন কি লোকেরা আল্লাহ তাআলার যিকির করতে পারবে অথচ সে খুতবা শুনতে পারছে? তিনি বললেন, না। কোন ঈদেই (খুতবা চলাকালীন) কথা বলবে না। 📖(মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক ৩/২৮৩, হাদীস : ৫৬৪০)

✒সুতরাং ঈদের খুতবা চলাকালীন মুসল্লীগণ তাকবীর বলবে না। বরং নিরব থেকে খুতবা শ্রবণ করবে।

📖-কিতাবুল আস্ল ১/৩৮৯; আদ্দুররুল মুখতার ২/১৫৯; আলমুহীতুল বুরহানী ২/৪৮৪

✒খুতবা চলাকালীন সময়ে কথাবার্তা বলা নিষেধ। এমনকি নবী করিম (সা.)-এর নাম উচ্চারিত হলে মুখে দরূদ পড়া নিষেধ। তবে অন্তরে পড়তে পারবে। তেমনিভাবে খুতবার মধ্যে দানবাক্স বা রুমাল চালানোও নিষেধ এবং গোনাহের কাজ। 📖-মুসনাদে আহমদ: ১০১৪০

✒নামাজের পর ঈদের দুই খুতবা শ্রবণ করা ওয়াজিব। যদি খুতবা শোনা না যায়, তাহলে চুপচাপ বসে থাকবে। অনেক লোক সালামের পর খুতবা না শুনেই চলে যায়, এটা সুন্নতের খেলাফ। 📖-আদ্দুররুল মুখতার: ২/১৫৯

✒উভয় খুতবা শেষ হলে ঈদের নামাজের সব কাজ শেষ হলো- এরপর ঈদের আর কোনো কাজ বাকী নাই। সুতরাং খুতবা শেষ হলে সবাই নিজের বাড়িতে ফিরে আসবে। বর্তমানে দেখা যায় যে, ঈদের খুতবার পরে লম্বা মোনাজাত হয়। এটা মোস্তাহাব নয়, তারপর লোকদের মধ্যে কোলাকুলির ভীড় লেগে যায় অথচ ঈদের সুন্নতের মধ্যে কোলাকুলি করার কথা নেই। সুতরাং এটা ঈদের সুন্নত মনে করা ভুল। বরং এটা দেখা-সাক্ষাতের সুন্নত। কোনো ভাইয়ের সঙ্গে অনেক দিন পরে সাক্ষাত হলে প্রথমে সালাম বিনিময় করবে। পরে মোসাফাহা করবে ও কোলাকুলি করবে। সুতরাং ঈদের নামাজের পূর্বে সাক্ষাত হলে তখনই এটা সেরে ফেলবে। আর যদি ঈদের খুতবার পর এরূপ কারও সঙ্গে সাক্ষাত হয় তাহলে কোলাকুলি করবে। এরূপ করবে না যে, সাক্ষাত হলো নামাজের পূর্বে কিন্তু কোলাকুলি করা হলো- খুতবার পরে। 📖-ফাতাওয়ায়ে শামী: ৬/৩৮১

মুফতী মাহমুদ হাসান।
*দারুল হাদীস (এম.এ,ইসলামিক স্টাডিস)
জামিয়াতুল আবরার বসুন্ধরা ঢাকা।
*আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ(অনার্স) ঢাকা।
*দারুল ইফতা  (ইসলামিক আইন ও গবেষণা বিভাগ) ঢাকা।

নিউজটি শেয়ার করুন


এ জাতীয় আরো খবর..