শনিবার, ১৫ মে ২০২১, ০২:৫৮ অপরাহ্ন

করোনার চেয়ে শক্তিশালী ভাইরাস “দারিদ্রতা”, যেখানে লকডাউন মরিচীকা!

অর্থনীতির কথা
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার ৮ এপ্রিল, ২০২১
  • ১৩৪ বার পঠিত

বিশ্বব্যাপী প্রবাহমান আতঙ্কের নাম নভেল করোনা ভাইরাস। চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান শহরে উৎপন্ন ভাইরাস ২০১৯ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত পুরো বিশ্বকে ভাবিয়ে তুলছে প্রতিনিয়ত।করোনা থেকে কো,ভাইরাস থেকে ভি,ডিজিজ থেকে ডি এবং প্রাদুর্ভাবের সময় ১৯ নিয়ে এর সংক্ষিপ্ত নামকরণ কোভিড-১৯।

বাংলাদেশ ২০২০সালের ৮ইমার্চে প্রথম রোগী সনাক্ত হওয়ার পর দেশ ব্যাপী আতঙ্ক ও নানামুখী গুজবে ভর করে। প্রাথমিকভাবে করোনাকে মানুষ যেভাবে নিয়েছে বর্তমান করোনায় ২য় প্রবাহে তাঁর বিন্দুমাত্র ভয় নেই!

স্বাস্থ্যবীধি মানার তেমন বালাই নেই। গত সোমবার থেকে সরকার করোনার ২য় ঢেউ মোকাবেলায় সারাদেশে ১সাপ্তাহের লকডাউন এর ডাক দেয়। মৃত্যু ও সংক্রমণের হার লাফিয়ে লাফিয়ে বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার লকডাউন এর সিদ্ধান্ত নেয় । লকডাউন এর সিদ্ধান্ত পরবর্তী বিভিন্ন জায়গায় ব্যবসায়ীরা বিক্ষোভ এর ডাক দেয়। যা গতবারের লকডাউনে লক্ষ্যনীয় ছিল না। অনিশ্চয়তা ও আশঙ্কা থাকার পরও দেশের মধ্যবিত্ত ও দারিদ্র জনগোষ্ঠী প্রথমবারের লকডাউন কে যেভাবে স্বাগত জানিয়েছিল বর্তমানে ২য় ঢেউতে মৃত্যু ও সংক্রমণ দ্বিগুণ থেকে তিনগুন হওয়ার পরেও জীবিকার চিন্তায় লকডাউন কে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের অনেকে বিভিন্ন যোগাযোগ ও সংবাদ মাধ্যমে করোনা নয়, ক্ষুধায় মরে যাওয়ার আশঙ্কা করে। প্রথমবারের লকডাউনে সরকার ঘোষিত করোনা প্রণোদনা সকল ছিন্নমূল মানুষের কাছে পৌঁছে নাই বলে অনেকে অভিযোগ করেন। দেশে এখনো এক-চতুর্থাংশ মানুষ দারিদ্র সীমার নিচে বাস করে। মোট শ্রমজীবী মানুষের ৮০শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন,সেখানে জীবন জীবিকার ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন। ২০১৯ সালে দারিদ্র্যের হার ২০ শতাংশ থেকে ৪০-৪১ শতাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। মধ্যবিত্ত, নিন্মবিত্তের অনেকে বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও বৃহৎ ঋণে জরজ্বরিত! হকার, রিক্সা, সি এন জি, ছোট গাড়ি চালিয়ে যারা সংসার নির্বাহ করে তারা কিভাবে ঋণের বোঝা বহন করবে?

শপিং মল ছাড়াও যারা ১ মাসি (রমজান) ব্যবসার উপর নির্ভর করে তাঁদের তো দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, তাদের চোখেমুখে হতাশার চাপ!তারা গত বছরের চাপ থেকে এই বছর মুক্তির যে আশা করেছে তার কি হবে? তারা তো বিক্ষোভ করবেই! যারা ছিন্নমূল মানুষ, দিনে আনে দিনে খায় তারা তো স্বাস্থ্যবীধির আগে পেটেরবীধি নিয়ে বেশি চিন্তিত! আপনারা যারা সরকারি চাকুরি করেন তারা তো বৌ-বাচ্চা নিয়ে অবকাশ যাপন করবেন, আপনারা ও যারা উচ্চবিত্ত আছেন তারা প্রথমে আপনার পাশের অবহেলিত মানুষের কথা ভাবুন।
তারা পেটের দায়ে রাস্তায় নেমে আপনাকেও ঋুঁকিতে পেলবে, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি গতবারের ন্যায় সহযোগিতা আরো বাড়িয়ে দিন।
সরকারের লক্ষ্যমাত্রার সাথে সমন্বয় হীনতা মানুষকে হতাশ ও স্বাস্থ্যবীধির প্রতি অনিহা তৈরি করেছে। যার কার্যকর উদাহরণ, চলমান বইমেলা।

সরকার প্রথমবারের যে লকডাউন দিয়েছিল সেটা যদি নমনীয় পর্যায়ে রেখে সবধরনের সেবা কার্যকম চালাত তাহলে এখন জনগনের লকডাউন প্রত্যাখ্যান করতো না! সরকারের সমন্বয়হীনতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত আমরা শিক্ষার্থীরা, আমরাও শিক্ষাজীবন শেষে পরিবারের কষ্ট লাঘবের স্বপ্ন দেখি। অনেক প্রতিষ্ঠানে শেষ বর্ষের একটা দুইটা পরীক্ষার জন্য কর্মস্থলে যোগদানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হযেছে। সরকার দেশের শিল্পকারখানাগুলোতে স্বাস্থ্যবীধি মানার শর্তে সীমিত আকারে যেভাবে কার্যকম শুরু করেছিল সেভাবে শিক্ষাকার্যকর্মের সমন্বয় করা যেত। আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া সময়গুলো কি রাষ্ট্রযন্ত্র সমন্বয় করবে? আমাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের জীবিকার্জনের যে কমিটমেন্ট সেটার দায় কি রাষ্টযন্ত্র রাখবে? লকডাউন পূর্ববর্তী দেশের সকল কার্যকম স্বাভাবিক থাকলেও শিক্ষাকার্যকর্মের প্রতি চরম অবহেলা করা হয়েছে। সভাসেমিনার, বিয়ে,জন্মদিন, পর্যটন, নির্বাচন সব হলেও শুধু শিক্ষাকার্যকর্ম স্থগিত!
ইতোমধ্যে ৪১ তম বি সি এস প্রিলি সহ বেশকিছু সরকারি বেসরকারি চাকুরি পরিক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে অনেক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা করোনাজটে বঞ্চিত হয়েছে! আমাদের বঞ্চনার দায় কি রাষ্টের নেই? আমরা যারা মধ্যবিত্ত ও নিন্মবিত্ত পরিবারে সন্তান রয়েছি তাঁদের সারাজীবনের কষ্টলাঘবের অঙ্গীকার পূরণে আমাদের ব্যর্থভাবে উপস্থাপিত করছেন।

আমাদের দেশ সম্প্রতি জাতিসংঘের নিন্মবিত্তের কাতার থেকে মধ্যবিত্তে আসার সুপারিশ পেয়েছে যদিও এই লক্ষ্য পূরণে আমাদের আরো সময় প্রয়োজন। সরকারের উক্ত লক্ষ পূ্রণে কার্যকর শিক্ষানীতি প্রণয়ন, দক্ষ প্রশাসন তৈরির জন্য শিক্ষার্থীদের হতাশা মুক্তির লক্ষ্যে সীমিত আকারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা ও স্থগিত পরীক্ষা নেওয়ার বিনীত আহবান জানাচ্ছি।
উন্নত দেশের মত কঠোর লকডাউনে রাখার সক্ষমতা আমাদের নেই! মৃত্যু ও সংক্রামণ এর হার বিবেচনায় সরকার ঘোষিত লকডাউন এর যে ঘোষণা সেটা নমনীয়তার পাশাপাশি রাষ্ট্রচিন্তায় ও সংকট রক্ষায় সকল জনগনের সহযোগিতা প্রয়োজন।

পরিশেষ, আমাদের দেশের আবহমান পরিস্থিতিতে টিকে থাকার যে সংগ্রাম, সেখানে করোনা ভাইরাসের চেয়েও শক্তিশালী “দারিদ্রতা”।যদিও বৈশিক মহামারি মোকাবেলায় সরকারি বিধি-নিষেধ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
আসুন আমরা স্বাস্থ্যবীধি মেনে চলি,মাস্ক পড়ি এবং জুরুরি প্রযোজন ব্যতিত ঘরত্যাগ না করি।

লেখক,
মোঃ সাহাবউদ্দিন,
শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

নিউজটি শেয়ার করুন


এ জাতীয় আরো খবর..