বৃহস্পতিবার, ১১ অগাস্ট ২০২২, ১১:৩৭ অপরাহ্ন

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে আ’লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা একাট্টা, ভয়ে দলীয় নেতারা

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩ নভেম্বর, ২০২১

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৃণমুল পর্যায়ের আওয়ামী লীগ দলীয় নেতা-কর্মীদের মাঝে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। একই ব্যক্তিকে বার বার দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার কারণে এ ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে মাঠ পর্যায়ের সাধারণ নেতা, কর্মী ও সমর্থকদের মাঝে।

তাদের দাবি যারা বিগত দিনে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন তাদের অনেকেই লাগামহীন অনিয়ম ও দুর্নীতি করে অবৈধ সম্পদ ও অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন। জনসেবার পরিবর্তে তারা জনদূর্ভোগের কারণে পরিণত হয়েছেন। ফলে তারা এখন জনবিচ্ছিন্ন। অথচ তাদেরকেই আবার আওয়ামী লীগ দলীয় মনোনয়ন দিয়ে পুরুস্কিত করা হয়েছে। আর এর মধ্যদিয়ে মাঠ পর্যায়ে আওয়ামী রাজনীতিতে পেরেক ঠুকে কফিনবন্দী করা হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে তৃণমুল থেকে আর কেউ রাজনীতির সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে আগ্রহী হবে না এমন মন্তব্য অনেকের।

বিতর্কিত ব্যক্তিরাই উপর মহলকে খুশি করে বার বার দলীয় মনোনয়ন পাবেন আর মাঠ পর্যায়ের নেতা কর্মীদের ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিবেন, তা কি তারা বার বার মেনে নিবেন? এমন উল্টো প্রশ্ন ক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীদের। তাদের দাবি, মাঠ পর্যায়ের যারা নিজেকে রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত করেন, তাদের প্রত্যাশা থাকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিয়ে সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত করে জনগণের দোড়গোড়ায় সেবা পৌঁছে দেয়া।

কিন্ত সে প্রত্যাশা বার বার হোচট খাচ্ছে বিতর্কিত সব একই ব্যক্তির কাউকে তিনবার বা একাধিকবার আওয়ামী লীগ দলীয় মনোনয়ন দিয়ে তাদের আরো দুর্নীতি করার দ্বার প্রশস্ত করার জন্য।

আগামী ২৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া দৌলতপুরে ১৪ ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ দলীয় বর্তমান চেয়ারম্যানদের হাতে আবারও নৌকা প্রতীক তুলে দিয়েছেন আওয়ামী লীগ দলীয় স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ড। অথচ যাদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে তাদের মধ্যে অনেকে বয়সের ভারে প্রতিবন্ধী হয়ে পড়েছেন। ঠিকমত চলা ফেরাও করতে পারেন না। অন্যের সহায়তা নিয়ে চলতে হয়।

মথুরাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সরদার হাসিম উদ্দিন হাসুকে তৃতীয়বার আওয়ামী লীগ দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। অথচ তিনি নিজেই চলা ফেরা করেন অন্যের সহায়তা নিয়ে। বিগত ৫ বছর তিনি নামে মাত্র চেয়ারম্যান ছিলেন, সব কাজ করেছে তার ছেলে।

মাতৃত্ব ভাতা, বয়স্ক ভাতা, ইউনিয়ন পরিষদের প্রত্যয়ন পেতে সেবা প্রত্যাশীদের গুনতে হয়েছে বিপুল অংকের টাকা।

একসময়ের দৌলতপুর জাসদের দাপুটে সভাপতি আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে এবার দিয়ে তৃতীয়বার হলেন নৌকার মাঝি। এসব দেখে শুনে নিজেকে এখন আওয়ামী লীগ দলীয় কর্মী ভাবতে কষ্ট হয়। এমনই অভিব্যক্তি ব্যক্ত করেছেন মথুরাপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আ’লীগ কর্মী হোসেন আলী স্বপন।

এ অভিব্যক্তি শুধু স্বপনের নয়, এমন অভিযোগ মথুরাপুর ইউনিয়নের অধিকাংশ মানুষ ও আওয়ামী লীগ দলীয় নেতা-কর্মীদের।

বোয়ালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন বিশ্বাস মহি। তিনি প্রতিবন্ধী হওয়া সত্বেও তাকেই তৃতীয়বারের মত পুরুস্কিত করা হয়েছে। বয়স্ক ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতার অর্থ আত্মসাতসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব কারণে ইউনিয়ন পরিষদের সকল সদস্য তার বিরুদ্ধে কয়েকবার অনাস্থা এনে উপজেলা পরিষদসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দিয়েছেন। কিন্তু তার পুরুস্কার হিসেবে তৃতীয়বারের মত তার হাতে নৌকার হাল ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এখন যে যত অনিয়ম দুর্নীতি করবে আর উপর মহলকে খুশি রাখবে তারাই বার বার পুরুষ্কৃত হবেন। এখানে দলের ত্যাগী নেতাদের কোন মুল্যায়ন হয়না, মুল্যায়ন হয় অর্থ দিয়ে।

বোয়ালিয়া ইউনিয়নের সর্বজন শ্রদ্ধেয় বীর মুক্তিযোদ্ধা ও প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতার এমন অভিব্যক্তি প্রকাশে সেখানে উপস্থিত সকলেই দলের নীতি নির্ধারকদের বিরুদ্ধে বিষোধগার করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ আহমেদ। যার আপাদ মস্তক পুরোটাই দুর্নীতিতে ভরা। বিগত ১০ বছরে চিরমারী ইউনিয়নের উন্নয়নের জন্য সরকারীভাবে এডিপি, কাবিখা, কাবিটাসহ অন্তত ৩০ কোটি টাকার বরাদ্দ হয়েছে। বরাদ্দের এ অর্থের অর্ধেকও যদি চিলমারীতে ঢেলে দেওয়া হতো তা’হলেও চিলমারীবাসী আধুনিক চিলমারী উপহার পেত। কিন্তু সরকারী বরাদ্দের পুরোটাই গেছে সৈয়দ আহমেদের পেটে।

মুল ভূ-খন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন অবহেলিত চিলমারীবাসী অবহেলার মধ্যেই রয়েছে আর অবৈধ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন সৈয়দ আহমেদ। আবার তার হাতেই নৌকার পাল তুলে দেওয়া হয়েছে যা চিলমারীবাসীর জন্য চরম লজ্বা ও অপমানের। এমন অভিযোগ চিলমারী ইউনিয়নের বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষকসহ সচেতন চিলমারীবাসীর।

তবে এটাও সত্য যে, বিগত ১০ বছরের মধ্যে চলতি বছরের প্রথম দিকে বর্তমান সংসদ সদস্যের প্রচেষ্টায় শুধুমাত্র পল্লী বিদ্যুতের আলো কিছু মানুষের ঘরে গেছে, এছাড়া কোন দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়েছে তা চোখে পড়েনি।এমন অভিযোগ শুধু মথুরাপুর, বোয়ালিয়া বা চিলমারীতে নয়, এ ধরণের অভিযোগ রয়েছে আড়িয়া, আদাবাড়িয়া, হোগলবাড়িয়া, রিফাইতপুরসহ সব ইউনিয়নেই।

একই প্রার্থীকে বার বার ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী করায় তৃণমুল পর্যায়ের রাজনীতির প্রতি সাধারণ মানুষের অনীহা ও অবজ্ঞার সৃষ্টি হয়েছে।

ফিলিপনগ ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত নির্যাতিত আওয়ামী লীগ নেতা সোহেল রানা ওরুশ কবিরাজ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিগত দুস্বমের পলাতক দুর্নীতিবাজ ফজলুল হককে বার বার দলের সভাপতি করা হবে আবার তাকে মনোনয়নও দেওয়া হবে তা’হলে আমাদের অবস্থান কোথায়। তাই আমাকে যদি মেরে ফেলা না হয় অথবা তুলে নিয়ে গিয়ে গুম করা না হয় তা’হলে আমি নির্বাচনের মাঠে আছি। ফিলিপনগরবাসী ঐক্যবদ্ধ আছে। নিশ্চয় আমার জয় হবে।

 

নৌকাবঞ্চিত আওয়ামী লীগ দলীয় নেতা-কর্মীরা নিজেদের যোগ্য প্রার্থী ভেবে চেয়ারম্যান পদে মনোনয়নপত্র দাখিল করে নিজ নিজ ইউনিয়নে গণসংযোগ শুরু করেছেন।

আবার বিভিন্ন ইউনিয়নে নৌকার বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে বিদ্রোহী স্বতন্র প্রার্থীরা সঙ্গবদ্ধ হচ্ছেন। তারা একতাবদ্ধ হয়ে নৌকাকে ডুবাতে মরিয়া অবস্থান নিতে যাচ্ছেন এমনও গুঞ্জন শুনা যাচ্ছে।

সব মিলিয়ে এবারের দৌলতপুরে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে নৌকার প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ। এদিকে যারা উপর মহলকে খুশি করে হ্যাট্রিক দলীয় প্রার্থী হয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে ঢাকা থেকে নিজ এলাকায় এসেছেন, তারাও প্রায় জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।

অদ্যাবধি নৌকার কোন প্রার্থীকে নিজ নিজ এলাকায় নির্বাচনী গণসংযোগে দেখা যায়নি। তবে এটাও তাদের নির্বাচনী কৌশল কিনা তা নিয়ে সন্দিহান আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।এদিকে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থীদের মাঝে উৎসবমুখর ভাব দেখা না গেলেও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পদচারনায় প্রতিদিনই উৎসবের আলো ছড়াচ্ছে উপজেলা পরিষদে।

বিভিন্ন ইউনিয়নের বিদ্রোহী প্রার্থীরা মোটরসাইকেল বহর নিয়ে উপজেলা পরিষদে গিয়ে রিটার্নিং অফিসারের নিকট মনোনয়ন জমা দিচ্ছেন। এতেকরে নির্বাচনী সাজ সাজ ভাব বিরাজ করছে দৌলতপুরে।

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে কুষ্টিয়া-১ দৌলতপুর আসনের এমপি ও দৌলতপুর আওয়ামী লীগের সভাপিত এ্যাড. আ. কা. ম. সরওয়ার জাহান বাদশাহ্ বলেন, দলের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ড দৌলতপুরের ১৪ ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যানদের নমিনেশন দিয়েছেন, তারা যাতে বিজয়ী হয় ভোটারদের প্রতি সে আহ্বান জানাচ্ছি। আর এটাই আমার প্রত্যাশা।

সর্বপরি আগামী ২৮ নভেম্বরের ভোটযুদ্ধে ভোটারদের স্বতন্ত্রভাবে ভোটাধিকারের সুযোগ দেওয়া হলে অধিকাংশই নৌকার প্রার্থীরা নির্বাচনে পরাজিত হবে বর্তমানে এমন অবস্থা বিরাজমান রয়েছে দৌলতপুরের সর্বত্র।

উল্লেখযোগ্য আলোচনার বিষয় পুরো দৌলতপুরের সাধারণ মানুষের মাঝে এম পি সম্পর্কে অনেক কিছুই জানা আছে এবং তারই প্রমাণ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের বিদ্রোহী প্রার্থীদের জয় লাভের মাধ্যমে প্রকাশিত হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত আজকের অর্থনীতি ২০১৯।

কারিগরি সহযোগিতায়:
x