বুধবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৭:১৯ পূর্বাহ্ন

কুষ্টিয়া মুক্ত দিবস আজ, শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে আলোচনা সভা 

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০২১
১৯৭১ সালের এই দিনে কুষ্টিয়া জেলার মুক্তিসেনারা রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করে ছোট-বড় ২২টি যুদ্ধ শেষে পাকবাহিনীর হাত থেকে কুষ্টিয়াকে মুক্ত করেছিলেন। অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হানাদার পাকসেনার বিরুদ্ধে সাহসী বাঙ্গালী তরুণ মুক্তিযোদ্ধারা অমিত তেজে অসীম সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করে কুষ্টিয়ার পবিত্র মাটি পাক-হানাদার সেনাদের হটিয়ে মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। হাজার হাজার মুক্তিকামী মানুষের গগণবিদারী ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে সেদিন কুষ্টিয়ার আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে উঠেছিল।
পথে প্রান্তরে গড়ে তোলা হয়েছিল ব্যারিকেড। লাঠি-সড়কি, ঢাল-তলোয়ার নিয়ে হরিপুর, বারখাদা, জুগিয়া, আলামপুর, দহকুলা, জিয়ারখী, কয়া, সুলতানপুর, পোড়াদহ, বাড়াদিসহ বিভিন্ন গ্রাম থেকে মানুষ ছুটে এসেছিল কুষ্টিয়া শহরে।
ঐতিহাসিক ৭ মার্চে রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণে সেদিন সেসব মানুষের চোখে মুখে ছিল মুক্তির নেশা, প্রাণে ছিল বঙ্গবন্ধুর শেষ উচ্চারণ- “এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” মুক্তির সনদ উচ্চারণকে বুকে ধারণ করে সারা দেশের ন্যায় কুষ্টিয়ার মুক্তিকামী মানুষেরাও প্রস্তুতি নেয় মুক্তির পথ অন্বেষণে। এই ভাষণের পরপরই বাঙালীদের প্রতিহত করতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ যুদ্ধ পরিকল্পনা হিসেবে পাক সেনাবাহিনীর ২৭ বেলুচ রেজিমেন্টের এক কোম্পানী সৈন্য ২৫ মার্চ রাতে যশোর সেনানিবাস থেকে কুষ্টিয়া এসে অবস্থান গ্রহণ করে এবং এক নাগাড়ে ৩০ ঘন্টার জন্য সান্ধ্য আইন জারী করে সশস্ত্র অবস্থায় টহল দিতে থাকে। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর মেজর আবু ওসমান চৌধুরী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিপক্ষে অবস্থান নেন। ঐ সময় ১ম বেঙ্গল রেজিমেন্টে লে. কর্ণেল রেজাউল করিমের নেতৃত্বে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিয়মিত শীতকালীন মহড়ায় যশোর ঝিকরগাছায় অবস্থান করছিল। এ সময় কুষ্টিয়ার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং আবু ওসমান চৌধুরীর মধ্যে আলাপ আলোচনা সাপেক্ষে ক্যাপ্টেন আযম চৌধুরীকে যশোরে ঝিকরগাছায় প্রেরণ করা হয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেয়ার জন্য। কিন্তু তার কোন ফলশ্রুতি না দেখে ক্যাপ্টেন আযম চৌধুরী সেখান থেকে ফেরত এসে মুজাহিদ, আনসার এবং স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ছাত্রসমাজ, সর্বস্তরের জনতাকে নিয়ে স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় কর্মসুচী অনুযায়ী ২৩ মার্চ কুষ্টিয়া ইসলামিয়া কলেজের মাঠে স্বতঃস্ফুর্ত জনতার উপস্থিতিতে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কুষ্টিয়া জেলা শাখার আহবায়ক আঃ জলিল পতাকা উত্তোলন করেন। এ সময়, সেখানে উপস্থিত ছিলেন, শেখ দলিল উদ্দিন, মারফত আলী, লোকমান হোসেন, জামাল উদ্দিন খালেদ, সাইফুদ্দিন তারেক, বীরপ্রতীক (যিনি পরবর্তীতে যুদ্ধে শহীদ হন) এবং সর্বস্তরের জনতা।
স্বাধীনতাপ্রিয় কুষ্টিয়ার মানুষ সেনাবাহিনীর দমনমূলক কার্যক্রম সেদিন মেনে নিতে পারেনি। সান্ধ্য আইন ভেঙ্গে তারা বেরিয়ে পড়ে রাস্তায়। তৈরি করে ব্যারিকেড। মজমপুর, থানাপাড়া, আমলাপাড়া, বড় বাজার গেটের কাছে জনসাধারণ রাস্তার উপর ইট-পাটকেল, গাছের গুঁড়ি, এমনকি ঘরের চাল নিয়ে এসে সেনাবাহিনীর চলাচল বিঘ্ন করার উদ্দেশ্যে ব্যারিকেড তৈরি করে। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী রাস্তা থেকে সেগুলো সরিয়ে ফেলে যেন আরো মারমুখী হয়ে যায়। শুরু হয়ে যায় তুমুল যুদ্ধ।
২৫ মার্চ বেলুচ রেজিমেন্টের ১৪৭ জন সৈন্য রাত ১১ টায় পুলিশ লাইন, জেলা স্কুল, থানাপাড়া ও আড়ুয়াপাড়াস্থ ওয়ারলেস অফিস ও টেলিগ্রাফ অফিসে অবস্থান গ্রহণ করে। অপরদিকে বেসামরিক মানুষ ও তৎকালীন রাজনৈতিক স্থানীয় নেতারা এরই মধ্যে বঙ্গবন্ধুর শেষ নির্দেশ পেয়ে মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। চারিদিকে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমান সিভিল সার্জন অফিসের সামনে ২৭ মার্চ একতলা ভবন থেকে মিজানুর রহমান রনি নামে এক তরুণ ছাত্র পাকসেনাদের গাড়ীর উপর হাতবোমা নিক্ষেপের সময় গুলিতে প্রাণ হারায়। মিজানুর রহমান রনিই মুক্তিযুদ্ধে কুষ্টিয়ার প্রথম শহীদ। কুষ্টিয়া পৌর গোরস্থানে তাঁর সমাধি বিদ্যমান৷
এ দিনই পাকবাহিনী শহরের বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষের উপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করে। এতে তাৎক্ষণিকভাবেই ৭ জন মারা যায়। তাদের মধ্যে কোর্ট ষ্টেশনের জ্ঞানা সেন, কোর্টপাড়ার হাসেমের নাম জানা যায়। পাক বাহিনীর অত্যাচার আর গণহত্যায় কুষ্টিয়ার জনগণ বিদ্রোহী হয়ে ওঠে।
ইপিআর-এর যশোর সেক্টরের নিয়ন্ত্রণাধীন মেজর এম এ ওসমান চৌধুরী উইং কমান্ডার এবং ক্যাপ্টেন সাদেক সহকারী অধিনায়কের দায়িত্বে ছিলেন। ৫ টি কোম্পানী ও ১ টি সাপোর্ট প্লাটুনের সমন্বয়ে ছিল ৪ নং উইং। এই উইং-এর অধীনে প্রাগপুর এলাকা ‘এ’ কোম্পানী কমান্ডার সুবেদার মোজাফ্ফর আহমেদ, ধোপাখালী এলাকা ‘বি’ কোম্পানী কমান্ডার সুবেদার খায়রুল বাশার খান, বৈদ্যনাথতলা (১৫ এপ্রিলের পর মুজিবনগর) ‘সি’ কোম্পানী কমান্ডার সুবেদার মুকিদ, যাদবপুর এলাকা‘ ডি’ কোম্পানী কমান্ডার সুবেদার মজিদ মোল্লা, উইং সদর দপ্তর ‘ই’ কোম্পানী কমান্ডার সুবেদার রাজ্জাক দায়িত্বে ছিলেন। এছাড়া সিগন্যাল প্লাটুন হাবিলদার মুসলেম উদ্দিনের অধীনে উইং সদর দপ্তরে অবস্থান করছিল। প্রত্যেকটি কোম্পানী প্রয়োজনীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ছিল। একটি কোম্পানীতে ৫ টা হালকা ট্যাংক বিধ্বংসী কামান, ৭ টা হালকা মেশিনগান, ১ টা মেশিনগান এবং বাকী ৩০৩ রাইফেল ছিল। উইং সদর দপ্তরে ১ কোম্পানী সৈন্য ছাড়াও ৬ টি ৩ ইঞ্চি মর্টার ও ২০০ চাইনিজ স্বয়ংক্রিয় রাইফেল ছিল। এ ছাড়া একটি ব্যাটালিয়ন যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য গোলাবারুদ ও যানবাহন চার নম্বর উইং-এ ছিল।
অপরদিকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অধিনায়ক ছিল মেজর শোয়েব। ক্যাপ্টেন শাকিল, ক্যাপ্টেন সামাদ ও লেঃ আতাউল্লাহ শাহ তার অধীনস্থ অফিসার হিসেবে কুষ্টিয়ায় অবস্থান করছিল।
পাক বাহিনীর সঙ্গে ছিল ১০৬ এমএম জীপ আরোহিত রিকয়েলস রাইফেল ভারী ও হালকা চাইনিজ মেশিনগান, স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, শক্তিশালী বেতারযন্ত্র এবং প্রচুর গোলাবারুদ।
মেজর ওসমান চৌধুরী ২৫ মার্চ রাতে সস্ত্রীক কুষ্টিয়া সার্কিট হাউসে অবস্থান করছিলেন। ২৬ মার্চ সকাল থেকে সামরিক কর্তৃপক্ষ ঢাকা থেকে বেতারে নতুন নতুন সামরিক বিধি জারী করতে থাকলে তিনি দ্রুত ঝিনাইদহ হয়ে চুয়াডাঙ্গা পৌঁছেই এক জরুরী সভা ডাকেন। ক্যাপ্টেন এ আর আযম চৌধুরী, ডাঃ আসাবুল হক এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও পুলিশ কর্মকর্তাগণ এক গোপন সভায় মিলিত হন। এদিকে ২৭ মার্চ সকালে পাঞ্জাবী ক্যাপ্টেন সাদেক যাদবপুর কোম্পানী সদর দপ্তরে এসে সৈনিকদের নিরস্ত্র হতে বলে এবং সে সময় জনৈক বাঙ্গালী গার্ডের সাথে ক্যাপ্টেন অসাদচরণ করলে সংঘর্ষ শুরু হয়। এতে ক্যাপ্টেন সাদেকসহ তার পাঞ্জাবী সহযোগীরা নিহত হয়। এই আকষ্মিক সংঘর্ষের পর মেজর আবু ওসমান চৌধুরী প্রশাসনিক বিষয়, সামরিক ও বেসামরিক সিদ্ধান্ত এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যোগাযোগ স্থাপন ও রাজনৈতিক সমর্থনের জন্য একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেন। সংসদ সদস্য ডাঃ আসাবুল হক, এ্যাডঃ ইউনুস আলী ও ব্যারিষ্টার বাদল রশীদ এই উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম সদস্য ছিলেন। উপদেষ্টা পরিষদের সাথে আলাপ করেই কুষ্টিয়া জেলা শত্রুমুক্ত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। মেজর ওসমান সীমান্তে অবস্থানরত সব ইপিআর সৈনিকদের চুয়াডাঙ্গা সদর দপ্তরে সমবেত এবং প্রাগপুরের কোম্পানী কমান্ডার সমবেত এবং প্রাগপুরের কোম্পানী কমান্ডার সুবেদার মোজাফফরকে কুষ্টিয়ার পথে অভিযান শুরু করার নির্দেশ দেন।
কুষ্টিয়া শহরের পুলিশ লাইন, জিলা স্কুল ও আড়ুয়াপাড়া ওয়ারলেসে পাকবাহিনী অবস্থান নিয়েছিল। তিনদিক থেকে একই সময় যুগোপৎ আক্রমণ করার পরিকল্পনা অনুযায়ী ক্যাপ্টেন আযম চৌধুরীকে জেলা স্কুলে অবস্থিত সৈন্য ঘাঁটির উপর আক্রমণ চালানোর আদেশ দেয়া হয়। এই তিনটি স্থানের মধ্যে জিলা স্কুল ছিল সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী পাক ঘাঁটি৷ সুবেদার মোজাফ্ফরকে পুলিশ লাইন ও নায়েক সুবেদার মনিরুজ্জামানকে (পরবর্তীতে শহীদ) ওয়ারলেস ষ্টেশন আক্রমণ করতে আদেশ দেয়া হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য কোনরকম ফিল্ড ওয়ারলেস বা ফিল্ড টেলিফোনও ছিল না তখন। অগত্যা টেলিফোন বিভাগের সাহায্যে পোড়াদহের আইলচারা গ্রামের একটি মাঠে ফিল্ড এক্সচেঞ্জ লাগানো হয়। ডাঃ আসহাবুল হকের নেতৃত্বে ফিল্ড চিকিৎসা কেন্দ্র, ডাক্তার ও ঔষধের ব্যবস্থা করা হয়। ২৮ মার্চ বেলা ১২ টার মধ্যে সীমান্তের সমস্ত কোম্পানী আদেশক্রমে চুয়াডাঙ্গায় সমবেত হয়। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী এক কোম্পানী সৈন্য ঝিনাইদহে পাঠানো হয়। সেখানে তারা যশোর-ঝিনাইদহ সড়ক অবরোধ করে, যেন যশোর সেনানিবাস থেকে কোন সৈন্য বা অস্ত্র কুষ্টিয়াতে পৌঁছাতে না পারে।
অন্য আর এক কোম্পানী সৈন্য ক্যাপ্টেন আযম চৌধুরীর নেতৃত্বে চুয়াডাঙ্গা পোড়াদহ কাঁচা রাস্তা দিয়ে পোড়াদহে পাঠানো হয়। ক্যাপ্টেন আযমের প্রতি নির্দেশ ছিল তার গন্তব্যস্থানে পৌঁছাবার পরেই যেন সে সুবেদার মোজাফফরের সাথে যোগাযোগ করে চুয়াডাঙ্গা হেড কোয়াটারে রিপোর্ট পাঠায়। পরিকল্পনা ছিল ক্যাপ্টেন আযমের কোম্পানী শহরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে অর্থাৎ সার্কিট হাউসে আক্রমণ করবে এবং সুবেদার মোজাফফরের কোম্পানী পুলিশ লাইন ও এক প্লাটুন সৈন্য এবং স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর কিছু লোক পূর্ব দিক থেকে নায়েব সুবেদার মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে মোহিনী মিল সংলগ্ন ওয়ারলেস ষ্টেশনের উপর আক্রমণ চালাবে। এবং ঐক্যবদ্ধ আক্রমণ হবে একই সময়ে তিনদিক থেকে। আক্রমণের তারিখ নির্ধারণ করা হয় ২৯ মার্চ ভোর ৪টা। সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থার অসুবিধার কারণে এবং ১ টা গাড়ী দুর্ঘটনার কারণে সুবেদার মোজাফফরের সৈন্য নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে পরের দিন অর্থাৎ ৩০ মার্চ ভোর ৪ টায় আক্রমণের সময় নির্ধারিত হয়। ৩০ মার্চ ভোর ৪ টায় তিনদিক থেকে অতর্কিতভাবে কুষ্টিয়ায় পাকবাহিনীর উপর আক্রমণ শুরু হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী আক্রমণের সাথে সাথে স্থানীয় হাজার হাজার জনগণ গগণবিদারী ‘জয় বাংলা’ জয়ধ্বনিতে কুষ্টিয়ার আকাশ বাতাস মুখরিত করে তোলে। এতে শত্রুপক্ষের মনোবল মারাত্মকভাবে ভেঙ্গে পড়ে। মাত্র এক ঘন্টা তুমূল যুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধা ও সৈন্যরা পুলিশ লাইন ও ওয়ারলেস কেন্দ্রের ভেতর ঢুকে শত্রু খতম করতে থাকে। উপায়ান্তর না দেখে সামান্য সংখ্যক পাকিস্তানী সৈন্য ভীত হয়ে তাদের অস্ত্রশস্ত্র ফেলে দিয়ে সদর দপ্তর জিলা স্কুলের দিকে পালিয়ে যেতে থাকে। পালাবার সময় অনেক পাক সৈন্য নিহত হয়।
পুরোদিনের যুদ্ধে একমাত্র জিলা স্কুল ছাড়া সমস্ত শহর মুক্তিবাহিনীর দখলে চলে যায়। বিজয় উল্লাসে মুক্তিযোদ্ধারা প্রবল শক্তিতে জিলা স্কুলের চারদিকে অবস্থান নিয়ে যুদ্ধ অব্যাহত রাখে। এ সময় হাজার হাজার মুক্তিকামী মানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের খাদ্য সরবরাহ করতে থাকে। এদিকে ওয়ারলেস সেটে শত্রুপক্ষের আবেদন ধরা পড়ে। যশোর সেনানিবাস থেকে প্রতি উত্তরে জানিয়েছিল, “তোমাদের সাহায্য করা সম্ভব নয়। নিজ চেষ্টায় আত্মরক্ষা কর।” পরদিন ৩১ মার্চ তুমূল যুদ্ধ চলে। সারাদিন যুদ্ধের পর জীবিত শত্রুর সংখ্যা ছিল ৪০/৫০ জন। তার মধ্যে অধিকাংশই অফিসার। গত্যন্তর না দেখে রাতের অন্ধকারে তারা ২ টি জীপ ও ১ টি ডজ গাড়ীতে চড়ে ঝিনাইদহের দিকে পালিয়ে যেতে চেষ্টা করে। মুক্তিযোদ্ধারা ঠিক পেয়ে ওদের পথ অনুসরণ করে। গাড়াগঞ্জ ব্রীজের কাছে মুক্তিযোদ্ধারা গর্ত খুঁড়ে সেটা ঢেকে রেখেছিল। পাকসেনারা তা জানত না। তাদের গাড়ী দুটো গর্তে পড়ে গিয়ে মেজর শোয়েবসহ শত্রুসেনারা মারা যায়। বাকীরা আহত অবস্থায় পাশ্ববর্তী গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সজাগ মুক্তিযোদ্ধা, স্বেচ্ছাসেবক ও জনগণ তাদের লাঠি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে। ১ লা এপ্রিল কুষ্টিয়া সম্পূর্ণরূপে শত্রুমুক্ত হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে চলে যায়। এই যুদ্ধে ৪ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং অনেকে আহত হন। পুর্ব নির্দেশ অনুযায়ী ক্যাপ্টেন আযম চৌধুরী কুষ্টিয়ায় অধিকৃত সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ ও গাড়ী ৩ এপ্রিল ভোরে চুয়াডাঙ্গায় পাঠিয়ে দেন।
ঐদিন চুয়াডাঙ্গায় ফরাসী টেলিভিশন কর্পোরেশনের ভ্রাম্যমান দল এসে হাজির, তারা মেজর ওসমান চৌধুরীর সাক্ষাৎকারে গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। সে সময় পর্যন্ত একমাত্র বিবিসি ও আকাশবাণী ছাড়া আর কোথাও আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক তথ্য প্রকাশ পায়নি। দীর্ঘ ১৫ মিনিট ধরে ওসমান চৌধুরীর সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। ঠিক এমনি সময় চুয়াডাঙ্গার উপর পাকিস্তান বিমানবাহিনীর বিমান হামলা শুরু হয়। বিমানে আর মাটিতে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ চলতে থাকে বেশ কিছুক্ষণ ধরে। এই সুযোগে ফরাসী টিভি সদস্যরা সে চিত্র বন্দী করে রাখেন। বাংলার মাটিতে নিক্ষিপ্ত হলো প্রথম নাপাম বোমা। এদিন কুষ্টিয়া শহরসহ বিভিন্ন এলাকায় এ বোমায় ক্ষত-বিক্ষত হলো বাংলার পবিত্র মাটি। কুষ্টিয়া শহরের যত্রতত্র বোমা এবং হেলিকপ্টারের মেশিন গানের আক্রমণ চললো। মুক্তিযোদ্ধারা সামান্য হাতিয়ার নিয়ে গুলি চালালো পাকিস্তানী বিমান দস্যুদের উপর। পাকসেনারা শোচনীয় পরাজয়ের পর কুষ্টিয়া পূর্ণদখলের জন্য সচেষ্ট হয়। আকাশ ও জলপথে যশোর সেনানিবাসে ব্যাপক সৈন্য ও অস্ত্র নিয়ে আসা হয়। এ সময় পাকবাহিনীর একটি দল আরিচা থেকে জলপথে ১১ এপ্রিল কুষ্টিয়ায় আসে। সামান্য সংখ্যক অস্ত্র সাথে নিয়ে নায়েব সুবেদার শামসুল হকের নেতৃত্বে একদল মুক্তিযোদ্ধা গোয়ালন্দে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তাদের উপর নির্দেশ ছিল, পাকসেনারা যেন কোনমতেই পদ্মার এপাড়ে অবতরণ করতে না পারে।
১৩ এপ্রিল অগ্রগামী সৈন্যের সাথে পদ্মার পাড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র সংঘর্ষ হয়। এতে পাকবাহিনীর একটি জাহাজ ডুবে যায় এবং তারা উত্তর দিকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। নগরবাড়ীতে অবতরণ করে পাকসেনারা তীব্র গতিতে পাবনার দিকে অগ্রসর হয়। ভেড়ামারায় অবস্থিত মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে প্রচন্ড গুলি বিনিময়ের পর পাকসেনারা ভেড়ামারা এলাকায় অবতরণ করে। ঐ কমান্ডের দায়িত্বে ছিলেন সুবেদার মেজর মোজাফফর। তিনি বাধ্য হয়ে তাঁর সেনাদল নিয়ে পিছু হটে যান। এ সময় ঝিনাইদহে তাদের পতন হয়। দীর্ঘ ১৭ দিন মুক্ত থাকার পর কুষ্টিয়া পুনরায় শত্রুদের হাতে চলে যায়। এরপর পাকসেনারা শহরে প্রবেশ করেই অগ্নিসংযোগ, গণহত্যা এবং ত্রাসের রাজত্ব চালিয়ে যায়। সে সময় শহরেও লোকসংখ্যা খুবই কম ছিল। যারা ছিল তারা পাক সেনার হাতে নিহত হন। পাকসেনারা বাঙ্গালীদের বাড়ি বেছে বেছে অগ্নিসংযোগ করে। এরপর ঢাকায় মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে সারাদেশকে শত্রু মুক্ত করতে এমএনএ, এমসিএ‘র ভোটের মাধ্যমে গঠিত জোনাল কাউন্সিল চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়।
বেছে বেছে যুবকদের বাছাই করে ভারতের বিভিন্ন জায়গায় গেরিলা ট্রেনিং দিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন সেকটরে তাদের প্রেরণ করা হয়। কুষ্টিয়ার বিভিন্ন রণাঙ্গনে প্রতিরোধ বাহিনীর পরাজয়ের পর এ জেলার স্বাধীনতার স্বপক্ষে রাজনৈতিক নেতা, ছাত্রনেতা, সেনাবাহিনীর সদস্য, ইপিআর, পুলিশ, আনসার, মুজাহিদ, ছাত্র, যুবক, মুক্তিকামী হাজার হাজার মানুষ দেশ ত্যাগ করে পালিয়ে যায়। ১৭ এপ্রিল বিকেলে তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার (পরবর্তীতে মুজিবনগর) আম্রকাননে ১০ এপ্রিল তারিখে গঠিত বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের শপথ গ্রহণ ও পরিচিতি অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনকে ১১ টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলা ৮ নং সেক্টরের অধীনে ছিল। মেজর আবু ওসমান চৌধুরী ৮ নং সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১০ ডিসেম্বর সকালে কুষ্টিয়া শহরের দক্ষিণে চৌড়হাস বি টি সি তামাক ক্রয় কেন্দ্রের কাছে জিকে ক্যানেলের ব্রীজের উত্তর পাশে প্রধান রাস্তায় মুক্তিবাহিনী-মিত্রবাহিনী যৌথভাবে পাকবাহিনীর সাথে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে সম্মুখীন হয়। এখানেও মিত্র বাহিনীর ৭০ জন শহীদ হন। ১০ ডিসেম্বর সন্ধ্যা পর্যন্ত কুষ্টিয়া জেলার সমস্ত এলাকা স্বাধীন ও শত্রু মুক্ত হয়। ১১ ডিসেম্বর কুষ্টিয়া শহর, পোড়াদহ, মিরপুর, ভেড়ামারা এলাকা স্বাধীন শত্রুমুক্ত হয়।
সেদিনের ধ্বংসলীলা কুষ্টিয়া শহরে আজও স্মৃতি বহন করে। এপ্রিল মাস থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সর্বমোট ২২ টি ছোট-বড় যুদ্ধ শেষে কুষ্টিয়া ১১ ডিসেম্বর শত্রুমুক্ত হয়েছিল। শত্রুমুক্ত কুষ্টিয়াতে তৎকালীন প্রাদেশিক পরিষদের জোনাল চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ চৌধুরী কুষ্টিয়া কালেক্টরেট চত্বরে অফিসিয়ালী জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে জোনাল কাউন্সিলের সেক্রেটারী এম শামসুল হক কে জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্বভার দেন।
মুক্তিযুদ্ধে কুষ্টিয়ার কবি, ছাত্র, সাহিত্যিক, শিল্পী, লেখক, সাংস্কৃতিক কর্মীদের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে হাউজিং এর খেলোয়াড় সরোওয়ার্দী, শিক্ষকদের মধ্যে ইসলামিয়া কলেজের অধ্যাপক দূর্গাদাস সাহা প্রমুখ শহীদ হন। সেদিনের কুষ্টিয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের ইতিহাস আজও মানুষের মনে দাগ কাটে।
আজ স্বাধীনতার ৫০ বছর পরেও পূর্ণাঙ্গরূপে আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ ও লালন করতে পারিনি! স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি বিভিন্ন ছদ্মবেশে এখনও বহাল তবিয়তে আছে৷ যার জলজ্যান্ত উদাহরণ গতবছর বিজয়ের মাসে কুষ্টিয়া শহরের পাঁচ রাস্তার মোড়ে বঙ্গবন্ধুর নির্মাণাধীন ভাস্কর্য ভাঙচুরের মত ধৃষ্টতা!
মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাঁথাকে হৃদয়ে লালন করে ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতার চেতনাকে আমরা যেন নতুন প্রজন্মের কাছে সঠিক ও শুদ্ধরূপে ছড়িয়ে দিতে পারি…  স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী এবং হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর শুভক্ষণে আজ ‘কুষ্টিয়া মুক্ত দিবস’-এ  আমাদের সকলের এই হোক অঙ্গীকার।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত আজকের অর্থনীতি ২০১৯।

কারিগরি সহযোগিতায়: