শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০, ০৩:১৮ অপরাহ্ন

কোভিড-১৯: অর্থনৈতিক বাস্তবতায় পরিবর্তিত কর নীতি

মোঃ সাইদুর রহমান রাফি
  • আপডেট টাইম : ৭ জুন, ২০২০
  • ৬০৩ বার পঠিত

বর্তমানে বিশ্ব এক কঠিন সময় পার করছে। থমকে আছে পৃথিবী জুড়ে মানুষের কর্মব্যস্ততা। স্থবির হয়ে পরেছে সকল অর্থনৈতিক কর্মকান্ড। সবাই একটি সুস্থ, স্বাভাবিক পৃথিবী ফিরিয়ে আনার জন্য নিজ নিজ জায়গা থেকে লড়াই করে যাচ্ছে। করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ যাই বলিনা কেন, এটা আমাদের মানবজীবনে যতটা প্রভাব ফেলছে ঠিক ততটাই প্রভাব ফেলেছে আমাদের অর্থনীতিতে।

এই মহামারিতে বিশ্ব ১৯৩০ সালের চেয়েও ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দা দেখবে বলে ধারণা করছে অর্থনীতিবিদরা। সদ্য উন্নয়নশীল দেশের সারিতে প্রবেশ করা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এই অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য যে ধরনের পদক্ষেপ গ্রহন করেছে বাংলাদেশ সরকার ও এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিল্প-কারখানা ও অন্যান্য খাতে মূলধনের তারল্য ধরে রাখার জন্য ঘোষণা করেছে বিভিন্ন প্রনোদনা, সহজ এবং নুন্যতম সুদের ঋণেরব্যবস্থা। এমন অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় সরকারের এমন পদক্ষেপ ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্যদের শক্তি ও সাহস যোগাবে যা সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য।

করোনাভাইরাস বিশ্ব অর্থনীতিতে যে সদূর প্রসারী প্রভাব ফেলেছে নিকট ভবিষ্যতে তা থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রস্তুতের আগে তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশ স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক ও রাজস্ব সংশ্লিষ্ট সিদ্বান্ত গ্রহন করেছে। অর্থনৈতিকভাবে শক্ত অবস্থানে থাকা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এই দুর্দশাগ্রস্থ অর্থনৈতিক অবস্থার সাথে কর ব্যবস্থার সামঞ্জস্যতা রক্ষার সাময়িক কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। মোটা দাগে বিবেচনা করলে এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো ব্যবসায় মূলধনের প্রবাহ বজায় রাখা, বিনিয়োগ সমুন্নত রাখা এবং ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের এই অর্থনৈতিক মন্দাবস্থায় টিকে থাকার লড়াইয়ে সামিল হওয়া। ব্যক্তিগত করদাতাদের উপর চাপ কমিয়ে কর পরিশোধে উৎসাহিত করা এর অন্যতম উদ্দেশ্য। দূর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশে এক্ষেত্রে চোখে পড়ার মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে আমার জানা নেই।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও বিস্তার রোধ করার জন্য দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। এই গরিব এবং অসহায় জনগোষ্ঠীর পাশে অনেক সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যাক্তি সামিল হয়েছেন। বঙ্গবন্ধু কন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডাকে সাড়া দিয়ে অনেকে ব্যাক্তিগতভাবে বা প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে সরকারি তহবিলে দান, বাড়ি ভাড়া মওকুফ এবং জরুরি চিকিৎসা সামগ্রীর সংকট মোকাবেলায় এগিয়েএসেছেন। এ সকল দানসমূহকে “করমুক্ত খরচ” হিসেবে ঘোষণা করে এবং গৃহসম্পত্তি হতে প্রাপ্ত আয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রমাণাদি বিবেচনা পূর্বক “খরচ” হিসেবে দেখানোর সুযোগ তৈরী করে দেয় তবে তা দুর্যোগ মোকাবেলায় অন্যান্যদেরও অনুপ্রাণিতকরবে। এমনকি, বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত সুরক্ষাসামগ্রী, ঔষধ, ভ্যাকসিন ইত্যাদি প্রস্তুতের জন্য প্রদত্ত বিনিয়োগকে “কর রেয়াত যোগ্য” বিনিয়োগ বা দানের খাত হিসেবে ঘোষণা করলে এই খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সম্ভাবনার দ্বার উন্মেচিত হবে।

এই ক্রান্তিকালীন সময়ে ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্য সেবায় সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিবর্গ, সাংবাদিক এবং পুলিশ সম্মুখভাগে থেকে লড়াই করে যাচ্ছেন। সমাজের এই অগ্রগামী সৈনিকদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে ২০১৯-২০২০ আয় বছরে সকল প্রকার কর মওকুফের বিষয়টি সরকার বিবেচনা করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করছি। আয়কর অধ্যাদেশ-১৯৮৪ অনুযায়ী, সরকারি বেতন আদেশভুক্ত কর্মচারী ব্যতিত সকল ধরনের কর্মকর্তা কর্মচারীদের চিকিৎসা বাবদ প্রাপ্ত ভাতার মূলবেতনের ১০% অথবা বার্ষিক ১,২০,০০০ টাকার মধ্যে যেটি কম সে পরিমান অংশ করমুক্ত। মহামারির এই সময়ে কোভিড-১৯ দ্বারা কেউ আক্রান্তহলে সেক্ষেত্রে তাদের চিকিৎসা ভাতার সম্পূর্ণ অংশ করমুক্ত আয় হিসেবে গণ্য করাই শ্রেয়। এছাড়া যারা ক্রমাগত এই লকডাউন পরিস্থিতির কারণে অস্থায়ী ভাবে চাকরি হারিয়েছে বা “লেঅফ” নীতি অনুসারে বেতন পাচ্ছেন তাদেরকে কর প্রধান হতে অব্যহতি দেয়া উচিত।

বাংলাদেশে ক্রমাগত ক্ষুদ্র কুটিরশিল্প, পোলট্রি, ফিশারি, আইটিপ্রতিষ্ঠান গুলোর সংখ্যা বেড়েই চলছে। ফলে একদিকে বাড়ছে এইসব প্রতিষ্ঠানে লোকবলের সংখ্যা, অন্যদিকে বাড়ছে দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থনে তরুণ উদ্যোক্তা ও তাদের অবদান। তাইক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের অস্তিত্ব রক্ষায় সময়োপযোগী করনীতি প্রণয়নের মাধ্যমে তাদের উপর কর এর চাপ কমানো একান্ত আবশ্যক। উদাহরণ স্বরূপ, থাইল্যান্ড বেতনাদির উপর কর পরিশোধের ক্ষেত্রে ৩০০ শতাংশ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের আয়ের খরচের উপর ১৫০ শতাংশ কর হার কমিয়েছে। বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে বলা যায়, ব্যবসায় পরিচালনার ক্ষেত্রে এরা যে সমস্যার সম্মূখীন হচ্ছে তা হলো- মূলধনের তারল্য সংকট। এই সংকট মোকাবেলায় বিভিন্ন দেশ “স্থগিতাদেশ” এর মাধ্যমে দুই অথবা তিন মাসের যে কোনো কর পরিশোধ স্থগিত করেছে। সার্কভুক্ত দেশ ভুটান বছরের এক চতুর্থাংশ কর পরিশোধ স্থগিত করেছে।

বাংলাদেশ প্রচলিত করনীতি অনুযায়ী ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান পূর্বানুমিত পরিশোধযোগ্য করের উপর ভিত্তি করে অগ্রীম ভিত্তিতে ত্রৈমাসিক হিসেবে কর এবং মাসিক হিসেবে ভ্যাট পরিশোধ করে থাকে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তা স্থগিত রাখলে ব্যবসায়ীদের জন্য কিছুটা স্বস্তিদায়কহবে।

সাধারণত বর্তমান বছরের অগ্রীম কর হিসাব করা হয় পূর্ববর্তী বছরের দাখিলকৃত কর হিসাবের উপর ভিত্তিকরে। বর্তমান বৈশ্বিক মন্দাবস্থায় অধিকাংশ ব্যবসায় ও শিল্প প্রতিষ্ঠান তাদের আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হবে। তাই যে হারে মাসিক অগ্রীম কর হিসাব করত তা কমানো উচিত বলে আমি মনে করি। পাশাপাশি, এই বিধান অনুযায়ী করদাতাদের অতিরিক্ত কর প্রদানে বাধ্য করা হয় যা কিনা “নুন্যতমকর” অধিক্ষেত্রের কারণে অফেরতযোগ্য হয়ে পড়ে এবং এটি এই আইনের একটি ক্রুটিপূর্ণ দিক। অন্যদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এই দূর্যোগকালীন সময়ে করদাতাদের তথ্য ও সহযোগীতার জন্য “অনলাইন ক্রাইসিস মেনেজমেন্ট সার্ভিস” চালু করতে পারে। সরকার কর্তৃক গৃহীত লকডাউন পরিস্থিতিতে করদাতা নির্দিষ্ট সময়ে আয়কর রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থ হলে, শুনানিতে উপস্থিত হতে না পারলে অথবা অডিট এর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সহযোগীতা করতে না পারলে তার ফলাফল ও সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রদান করতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে।

বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে একটি বিষয় পরিস্কার যে, অর্থনীতির উপর মহামারির প্রভাব সকল খাতে সমান নয়। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক দিক বিবেচনায় তা বলা যেতে পারে।

পর্যটন, পোশাক শিল্প খাত যতটা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ঔষধশিল্প বা স্বাস্থ্য সেবায় সুরক্ষা সামগ্রী প্রস্তুতকারী খাতগুলো ততটা ক্ষতিগ্রস্থ হয়নি। সুতরাং অনতিবিলম্বে একটি জাতীয় কমিটি গঠন করে দীর্ঘমেয়াদি পলিসি গ্রহণের পাশাপাশি জরুরি অবস্থায় রাজস্ব খাতকে গতিশীল রাখতে সরকারকে এখনি সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পাশাপাশি গবেষণার মাধ্যমে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দিক বিবেচনা করে এবং কোন কোন খাতগুলোতে অধিকতর গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন তা নির্ণয় করে সাময়িক করনীতি প্রকাশ করা এখন সময়ের দাবি। যেহেতু রাজস্ব খাত সরকারের আয়ের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস সেহেতু পৃথিবীতে অন্যান্য দেশের মত বৃহৎ পরিসরে কর স্থগিত বা মওকুফ করা না গেলেও আবেদনের প্রেক্ষিতে প্রমাণাদি ও অন্যান্য দিক বিবেচনা পূর্বক প্রকৃত পক্ষে ক্ষতিগ্রস্থ ব্যবসায় ও ব্যাক্তির পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থা আনতে হবে। বৈশ্বিক এই অর্থনৈতিক দুরাবস্থায় ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ আকারের ব্যবসায় ও উদ্যোক্তাদের জন্য সহনীয় পর্যায়ে কর প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি করলে তা ভবিষ্যতেও নিয়মিত ও সঠিক পরিমানে কর প্রদানে অনুপ্রাণিত করবে।

লেখকঃ
মোঃ সাইদুর রহমান রাফি
এল এল বি, এল এল এম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
পোস্ট গ্রেজুয়েট ডিপ্লোমা ইন ট্যাক্স ম্যানেজমেন্ট (অধ্যয়নরত)।
s.r.rafilaw@gmail.com

নিউজটি শেয়ার করুন


এ জাতীয় আরো খবর..