শুক্রবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২০, ০৭:২০ পূর্বাহ্ন

দক্ষিণ এশিয়ায় করোনার তীব্রতা বাড়াতে পারে শীতের বায়ুদূষণ

অর্থনীতি ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার ১৮ অক্টোবর, ২০২০
  • ৩৩ বার পঠিত

কভিড-১৯ মোকাবেলায় দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে লকডাউন বায়ুদূষণের মাত্রায় নাটকীয় হ্রাস নিয়ে এসেছিল। পেশোয়ার থেকে গুয়াহাটি পর্যন্ত বিস্তৃত সুনীল ও নির্মল আকাশ দক্ষিণ এশিয়ার তীব্র বায়ুদূষণ কমানোর সম্ভাবনাও জাগিয়ে তুলেছিল। কিন্তু লকডাউন শীতল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দূষণের স্তর ফের আগের জায়গায় ফিরে গিয়েছে।

এখন গবেষকরা বলছেন, বায়ুদূষণজনিত সমস্যা আসন্ন শীতে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে করোনাভাইরাস মহামারীর সংক্রমণকে আরো তীব্র ও মারাত্মক করে তুলতে পারে। এ অঞ্চলে বায়ুদূষণের মাত্রা চূড়া স্পর্শ করে প্রত্যেক শরৎ ও শীতে। এ সময় কৃষি বর্জ্য পোড়ানো, শিল্প-কারখানা, গাড়ির ধোঁয়া এবং ইটভাটা সব মিলিয়ে বিষাক্ত এক পরিবেশ তৈরি হয়।

বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও পাকিস্তান এরই মধ্যে চীনকে টপকে গিয়ে সবচেয়ে বেশি দূষণের শহরের দেশে পরিণত হয়েছে। লাখ লাখ মানুষ প্রতি বছর মারা যাচ্ছে বিষাক্ত ধোঁয়া নিঃশ্বাসে টেনে নিয়ে। মানুষের আয়ু কমেছে গড়ে পাঁচ বছর করে। দক্ষিণ ভারতের সবচেয়ে দূষিত অঞ্চলে এটি আট বছরের বেশি।

কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার সরকারগুলো এ বিষয়ে উপযুক্ত প্রতিক্রিয়া দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। ভারতে আন্দোলনকারীরা সরকারের ন্যাশনাল ক্লিন এয়ার প্রোগ্রাম যথেষ্ট নয় বলে সেটিকে খারিজ করেছে। ভারতের কিছু রিয়েলটাইম পরিসংখ্যান হাতে থাকলেও বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নেপালে এখনো বায়ুদূষণ পর্যবেক্ষণ করার মৌলিক সরঞ্জামের অভাব রয়েছে।

দূষণ ও কভিড-১৯-এর সম্পর্ক

পিয়ার রিভিউর অধীনে থাকা কিছু গবেষণা বলছে, মহামারীর আগে দীর্ঘ সময় বায়ুদূষণের সংস্পর্শে থাকার ফলে কভিড-১৯- এর লক্ষণগুলো আরো তীব্র হয় এবং মৃত্যুঝুঁকিও আরো বেড়ে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির একটি জরিপে দেখা গেছে, মহামারীর আগের বছরগুলোতে বিশেষ দূষণের উচ্চস্তর কভিড-১৯-এ মৃত্যুকে ৮ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে।

নেদারল্যান্ডসের আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, দূষণের সংস্পর্শে আসার বিষয়টি স্বল্পমাত্রায় বাড়লেও তাতে মৃত্যুহার বাড়তে পারে ২১ শতাংশ পর্যন্ত। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, ব্যবহার পদ্ধতি ও ফলাফলগুলো সামগ্রিক এবং মূল্যায়িত হওয়া জরুরি। রোগের বিকাশে বায়ুদূষণ কেমন প্রভাব ফেলে, তা বুঝতে আরো অনেক বেশি পরিসংখ্যানের প্রয়োজন রয়েছে।

তবে দক্ষিণ এশিয়া থেকে প্রাপ্ত প্রমাণগুলো বেশ দুর্লভ। ভারতের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কবার্তাগুলোরই পুনরাবৃত্তি করেছে এবং সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে বলেছে।

ভারতের সেন্ট্রাল পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ডের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ টিকে যোশী বলেন, আমাদের সবচেয়ে বড় ভয় হচ্ছে শীতের আগমন এবং বায়ুদূষণ বাড়ার সঙ্গে কভিড-১৯ পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠতে পারে। অথচ আমাদের স্বাস্থ্য অবকাঠামো তীব্র চাপের মুখে আছে।

বায়ুদূষণ ও মহামারীর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে যোশী বলেন, বায়ুর গুণগত মানের প্রভাব ব্যক্তির ইমিউনিটির ওপর পড়ে। বায়ুদূষণ নিশ্চিতভাবেই পরিস্থিতিকে অনেক বেশি খারাপ করে তুলবে।

ভারত মহামারী দ্বারা বিস্তৃতভাবে আঘাতপ্রাপ্ত দেশগুলোর একটি। যুক্তরাষ্ট্রের পর তাদের কেসের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। সেই দেশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অপুষ্টির পর বায়ুদূষণকে সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ বলে বর্ণনা করে।

এপিডেমিওলজিস্ট পূর্ণিমা প্রভাসকরণ বলেন, বায়ুদূষণ ও ভাইরাসের সংস্পর্শের দ্বৈত হাহাকার নিশ্চিতভাবেই ভারতের বিদ্যমান স্বাস্থ্যঝুঁকিকে আরো বাড়িয়ে দেবে।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্যের ওপর দূষিত বায়ুর প্রভাব সর্বজনবিদিত এবং দুর্বল জনগোষ্ঠীর ওপর এর প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে নেতিবাচক। যেখানে অধিক বয়স্ক, গর্ভবতী নারী এবং যাদের অন্যান্য সমস্যা বিদ্যমান আছে তারাও অন্তর্ভুক্ত।

তিনি আরো বলেন, দূষিত বায়ুর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে সংস্পর্শে আসার ফলে তা মানুষের ফুসফুসের কার্যকারিতাকে দুর্বল করে দেয়। এসব ব্যক্তি কভিডের জন্য আরো বেশি সংবেদনশীল হয়ে পড়ে।

অন্য গবেষণা বলছে, বাতাসে দূষিত কণার স্তর বৃদ্ধি কভিড-১৯ সংক্রমণকে বাড়িয়ে দেয়। ইউনিভার্সিটি অব দিল্লির কলেজ অব মেডিকেল সায়েন্সের ডিরেক্টর অরুণ শর্মা বলেন, পিএম২.৫ এবং পিএম১০ (২.৫ মাইক্রোমিটার বা তার কম বস্তুকণা এবং ১০ মাইক্রোমিটার বা তার কম বস্তুকণা)-এর উচ্চঘনত্ব করোনাভাইরাসকে লেগে থাকার উপযুক্ত পৃষ্ঠতলের ব্যবস্থা করে এবং অনেক দূর পর্যন্ত এটি স্থানান্তরিত হতে পারে। এছাড়া দূষকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ভাইরাস অনেক দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকতে পারে।

শর্মা বলেন, এটা পরিষ্কার যে কর্তৃপক্ষ যখন মহামারীর সঙ্গে লড়াই করছে তখন তারা বায়ুদূষণকে আগামীকালের জন্য ফেলে রাখতে পারে না। এই দুটো জটিলভাবে সম্পর্কিত এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর ব্যাপক আকারে প্রভাব ফেলে।

সমাধান কী?

অক্টোবরের শুরুতে দিল্লির বাতাসের মান গত তিন মাসে প্রথমবারের মতো দুর্বল ক্যাটাগরিতে নেমে গিয়েছিল। সরকার এটিকে শ্বাসকষ্ট ও হূদরোগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এ অবনতির আংশিক কারণ ছিল শীতের ফসলের জন্য কৃষকদের তাদের জমি পরিষ্কার করার কর্মসূচি। গড়ে বছরে শরতের দুই থেকে তিন সপ্তাহে খড়ের জ্বলন শীর্ষে থাকে। যা দিল্লিতে ২০ শতাংশ পিএম২.৫ ঘনত্বের জন্য দায়ী।

এটি একটি বহুল আলোচিত সমস্যা। কিন্তু অন্য কোনো বিকল্প না থাকায় কৃষকদের কাছেও আর কোনো উপায় নেই। এয়ার কোয়ালিটি বিষয়ক বিজ্ঞানী পল্লভী পান্তের মতে, ভারতের রাজধানীতে কর্তৃপক্ষকে ডিজেল জেনারেটরের ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে এবং জলকামান ব্যবহার করতে হবে ধুলোকে নিচে নামিয়ে আনার জন্য।

দূষণের পরিমাণ ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমিতেও বেশ খারাপ। কিন্তু কার্যকর বায়ুমান পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্কের অভাবে অনেক মানুষ এ ঝুঁকি সম্পর্কে জানেই না।

কাউন্সিল অন এনার্জি, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ওয়াটারের বায়ুমান বিশেষজ্ঞ তনুশ্রী গাঙ্গুলী কর্তৃপক্ষ কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে তা বর্ণনা করেছেন। এখানে রয়েছে দূষণের উৎস চিহ্নিত করার জন্য তালিকা তৈরি করা এবং কার্যকর প্রতিক্রিয়া দেখানো। পাশাপাশি দেশব্যাপী বায়ুমান পর্যবেক্ষণের নেটওয়ার্ককে বিস্তৃত করা। এছাড়া সিইইডব্লিউ আহ্বান জানিয়েছে ২০২৪ সালের মধ্যে পুরনো এবং অদক্ষ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো যেন বাতিল করা হয়।

অন্যদিকে মহামারীর বিস্তৃতির সঙ্গে গ্রামীণ নারীরা বিশেষভাবে ঝুঁকিতে রয়েছেন। গবেষণাও দেখাচ্ছে বায়ুদূষণের ক্ষেত্রে গ্রামের মহিলারা অধিক সংবেদনশীল। কারণ অনেকেই বায়োমাস কিংবা পশুর বিষ্ঠা ব্যবহার করে রান্নার জন্য। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক জরিপও দেখিয়েছে গৃহস্থালির বায়ুদূষণের সঙ্গে কভিড-১৯-এর টেস্টে পজিটিভ আসার মাঝে যোগ রয়েছে। অভ্যন্তরীণ বায়ুদূষণ অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে মহিলা ও শিশুদের ওপর প্রভাব ফেলে, যারা কিনা গ্রামীণ জনপদে বদ্ধ স্থানে অনেক বেশি কাটায়।

স্ক্রলডটইন

নিউজটি শেয়ার করুন


এ জাতীয় আরো খবর..