বুধবার, ২০ জানুয়ারী ২০২১, ০৪:২৮ অপরাহ্ন

‘দেশের তরে একদল কলমযোদ্ধা’

সিলভিয়া আক্তার
  • আপডেট টাইম : বুধবার ১৬ ডিসেম্বর, ২০২০
  • ১৭২ বার পঠিত

যুদ্ধ হয় অস্ত্রে, যুদ্ধ হয় কলমে। পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ একটি মাত্র দেশ, যে দেশ ১৯৭১ সালে অস্ত্রের পাশাপাশি কলম নিয়েও ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো বাংলার মাটি থেকে পাকিস্তানিদের উৎখাত করতে। যুদ্ধ শব্দটি শোনা মাত্র আজও বাঙালির হৃদয় কেঁপে উঠে। ৭১’র মুক্তিযুদ্ধের নৃশংস হত্যাযজ্ঞের চিত্র ভেসে আসে তাদের চোখে। বাঙালির জাতীয় জীবনের ঐতিহাসিক ঘটনা ৭১’র মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানিদের শাসন-নির্যাতনে থাকার পর ১৯৭১-এ বাংলার আকাশে উদয় হয়েছিল স্বাধীনতার লাল সূর্য।
বাংলার মাটি ও জনগণকে রক্ষা করতে একদল বীর যুদ্ধে নেমেছিল অস্ত্র হাতে আরেক দল বীর নেমেছিল কলম হাতে। পাকিস্তান শাসনামল থেকে শুরু করে ৭১’র মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত পাকিস্তানিদের শাসন, অত্যাচার ও হত্যাকাণ্ড পুরো বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে,  ঐক্যমত্য তৈরী করতে ও  বাঙালিকে দেশপ্রেমে উদ্ধুদ্ধ করতে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকেরা  অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলো মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় ধরে। কখনো ছদ্মবেশে, কখনো সৈনিক হয়ে বা কখনো নিজের জীবন বাজী রেখে দেশের ভেতরে ও দেশের বাইরে সংবাদ প্রচার করেছিলো সাংবাদিকেরা। মুক্তিযুদ্ধের সময় সংবাদপত্র, সাংবাদিকেরা ও গণমাধ্যম গুলো যে ভূমিকা পালন করেছিলো তা ইতিহাসের পাতায় উল্লেখিত।  কলম হাতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন বহু সাংবাদিক। তাদের মধ্যে শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সার, খোন্দকার আবু তালেব, নিজামুদ্দীন আহমদ, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, এস এ মান্নান (লাডু ভাই), আব্দুস গাফফার চৌধুরী, রণেশ দাশগুপ্ত, আ ন ম গোলাম মোস্তফা, সৈয়দ নাজমুল হক, আবুল বাশার, কামাল লোহানী, শিব সাধন চক্রবর্তী, চিশতী শাহ হেলালুর রহমান, মুহম্মদ আখতার, সেলিনা পারভীন, এ কে এম শহীদুল্লাহ্ (শহীদ সাবের) অন্যতম। সংবাদপত্রের মধ্যে রয়েছে-দৈনিক ইত্তেফাক, সংবাদ, অবজারভার, পূর্বদেশ, জনপদ ইত্যাদি।
উইকিপিডিয়া থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, মুক্তিযুদ্ধের সময় সারা দেশে ১১১১ জন বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়েছিল। এর ভেতর ১৩ জন ছিলেন সাংবাদিক। পাকিস্তানিরা দৈনিক সংবাদ, ডেইলি পিপল ও দৈনিক ইত্তেফাক সহ সংবাদপত্র অফিস গুলোতে চালিয়েছিলো ধ্বংসলীলা এবং ২৫শে মার্চ কালরাতে ইত্তেফাক ভবন আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়, যাতে করে তাদের হত্যাযজ্ঞ-এর বর্ণনা দেশের বাইরে না যায়। কিন্তু শত চেষ্টা করেও তারা দমিয়ে রাখতে পারেনি সাংবাদিকদের। ঐসময় পরিস্থিতি এমন ছিলো যে, দেশের সংবাদপত্রের জন্য লিখতে হলে তারা সরাসরি কিছু লিখতে পারতেন না, কৌশলে লিখতে হতো তাদের। সোজাসাপ্টা না লিখে ঘুরিয়ে উপস্থাপন করতে হতো। যা পাকিস্তানিরা না বুঝলেও সাধারণ বাঙালি ঠিক বুঝতে পারতো। বিশিষ্ট সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা আবেদ খান দৈনিক ইত্তেফাকে কাজ করতেন। ২৯ মার্চ তিনি ঢাকা ছেড়ে চলে যান এবং পাকিস্তানিদের ধ্বংসলীলা কলকাতার আকাশবাণী বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেন তিনি।
যুদ্ধের নয় মাসে অবরুদ্ধ বাংলাদেশ থেকে ব্যক্তি ও সংগঠনের উদ্যেগে বেশ কিছু পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিলো। যেমন- দৈনিক জয়বাংলা, জন্মভূমি, বাংলার বাণী, দৈনিক বাংলাদেশ, বঙ্গবাণী, চিত্রাঙ্গদা, সাপ্তাহিক বাংলার মুখ, স্বদেশ ইত্যাদি। এছাড়াও লন্ডন থেকে বাংলাদেশ সংবাদপত্র পরিক্রমা, বাংলাদেশ নিউজ লেটার, আমেরিকা থেকে বাংলাদেশ পত্র ইত্যাদি। মুক্তিযুদ্ধের সময় বিদেশি সাংবাদিকদেরও ভূমিকা ছিলো অনেক। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে কলকাতা প্রেসক্লাবের সাংবাদিকেরা ছিলেন কলমযোদ্ধা ও কলম সৈনিক। সাইমন ড্রিং(দৈনিক দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফের প্রতিবেদক), অ্যান্থনি মাসকারেনহাস(করাচির মর্নিং নিউজের সাংবাদিক ও ব্রিটেনের সানডে টাইমস পত্রিকার পাকিস্তান সংবাদদাতা), মার্ক টালি(বিবিসির দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সংবাদদাতা), সিডনি শনবার্গ(নিউইয়র্ক টাইমসের দক্ষিণ এশীয় সংবাদদাতা) প্রমুখ বিদেশি সাংবাদিকরা মুক্তিযুদ্ধের চিত্র পুরো বিশ্বের কাছে তুলে ধরে বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন আদায় করেছিলো।
বাংলার স্বাধীনতা সম্ভব হতো না এই অকুতোভয়-দুঃসাহসী সংগ্রামীদের ছাড়া। যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাংলার মানুষকে সাহস জুগিয়ে ছিলেন। আজও বাংলাদেশের সাংবাদিকেরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। দেশের কঠিন পরিস্থিতি গুলোতে দায়িত্বশীলতার সাথে কাজ করছেন।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দর্পণ সংবাদপত্র। সাংবাদিকদের ছাড়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। তবে সাংবাদিকতা এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। সঠিক-সত্য সংবাদ প্রচারের প্রতিবন্ধকতা গুলো দূর করতে পারলে একটি সুষ্ঠ স্বাভাবিক দেশ গঠন করা সম্ভব। ৭১’র মুক্তিযুদ্ধের দিকে দৃষ্টিপাত করলে বোঝা যায়- সাংবাদিকেরা একটি দেশের কতটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশকে রক্ষা করতে তাদের জীবন বাজী রাখতে হয়। সত্যনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে বর্তমানে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। সংবাদমাধ্যম এমন সব ব্যক্তিদের হাতে চলে যাচ্ছে, যারা সংবাদমাধ্যমকে ব্যবহার করছেন রাজনীতি, ব্যবসা অথবা ব্যক্তি স্বার্থে৷ এর ফলে ঝুঁকির মুখে পড়ছেন সাংবাদিকেরা৷ সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের দিতে হবে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ। নারী সাংবাদিকতা নিয়ে যে ভয় আমাদের সমাজে রয়েছে তা দূর করে তাদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের পাশাপাশি সমাজের সকল স্তরের মানুষকে সাংবাদিকদের সাথে গড়ে তুলতে হবে বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক। তারা কলমযোদ্ধা, তারা বাংলার বীর।

নিউজটি শেয়ার করুন


এ জাতীয় আরো খবর..