রবিবার, ০১ অগাস্ট ২০২১, ০৭:০৫ অপরাহ্ন

পোলট্রি খাতে আবারো বড় ক্ষতির শঙ্কা

অর্থনীতি ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার ১১ এপ্রিল, ২০২১
  • ১৭২ বার পঠিত

নভেল করোনাভাইরাসের কারণে গত বছরের লকডাউন ও সাধারণ ছুটিতে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছিল পোলট্রি খাতে। ক্রেতাশূন্যতা ও বাজারে প্রবেশ করতে না পারায় লেয়ার ও ব্রয়লার মুরগির বিক্রি কমে গিয়েছিল। একদিনের মুরগি বিক্রি ও ডিমের দামও কমে যায়। এ বছরও নভেল করোনাভাইরাস পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হওয়ায় এক সপ্তাহের লকডাউন চলমান থাকাকালেই আরো এক সপ্তাহের কঠোর লকডাউনে যাওয়ার চিন্তা করছে সরকার। সংক্রমণ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এ লকডাউনের মেয়াদ আরো বাড়তে পারে। এ অবস্থায় লকডাউন আতঙ্কে ভুগছেন দেশের পোলট্রি খাতের উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী ও খামারিরা। তারা আবারো পোলট্রি খাতে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন। এজন্য লকডাউন হলে আগে থেকেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের পর গত বছরের মার্চের শেষদিকে দেশে লকডাউন শুরু হয়। দফায় দফায় এর মেয়াদ বাড়ানো হয়। দীর্ঘ এ লকডাউনের সময় লেয়ার মুরগি বিক্রি ৩৫ শতাংশ, ব্রয়লার মুরগি বিক্রি ৬০ শতাংশ এবং একদিনের মুরগি বিক্রি কমে গিয়েছিল প্রায় ৫০ শতাংশ। পোলট্রি খামার বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছিলেন একদিনের বাচ্চা উৎপাদনকারীরা। এক মাসের ব্যবধানে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত শতাধিক ফার্মে বাচ্চা উৎপাদন বন্ধ করতে হয়েছিল। এছাড়া নষ্ট করতে হয়েছিল প্রায় এক কোটি পিস একদিনের বাচ্চা। সব মিলিয়ে এ খাতে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়। এদিকে চলতি মাসে ঘোষিত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সামনের দিনে কঠোর লকডাউনের ঘোষণায় গত কয়েক দিনে একদিনের মুরগির বাচ্চার দাম কমে গেছে। এর প্রভাবে বাজারে মুরগির দামও কমতির দিকে। ডিমের দামও কমেছে। এতে ক্রেতার স্বস্তি মিললেও খামারিদের দুশ্চিন্তা বাড়ছে। ব্যবসায়ীরা শঙ্কা প্রকাশ করছেন, কঠোর লকডাউন হলে পাইকারি বাজার থেকে শুরু করে খুচরা বাজার-হাটে ক্রেতার উপস্থিতি ব্যাপক হারে কমবে। এ কারণে সব ধরনের পোলট্রি পণ্য বিক্রিতে ধস নেমে আসতে পারে।

বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) তথ্য বলছে, দেশের মানুষের প্রাণিজ আমিষ চাহিদার প্রায় ৪৫ শতাংশ সরবরাহ করছে পোলট্রি খাত। আত্মকর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৬০ লাখ মানুষের। ২০১৯-২০ অর্থবছরে দৈনিক ডিম উৎপাদন ছাড়িয়েছে ৪ কোটি ৬৬ লাখ পিস, দৈনিক মুরগির মাংস উৎপাদন তিন হাজার টন, একদিন বয়সী বাচ্চা প্রতি সপ্তাহে উৎপাদন হচ্ছে ১ কোটি ৮০ লাখ, দৈনিক পোলট্রি ফিড উৎপাদন হচ্ছে ৯ হাজার ৮৬৩ টন। খাতটিকে ঘিরেই দুই শতাধিক শীর্ষস্থানীয় করপোরেট প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। আশির দশকে বছরে একজন মানুষ মাংস গ্রহণ করত মাত্র দুই কেজি আর এখন সেটি ছয় কেজিতে উন্নীত হয়েছে। আবার সেই সময়ে ডিম গ্রহণের পরিমাণ ছিল মাত্র ১৮ পিস, এখন সেটি ১০৫ পিসে উন্নীত হয়েছে। বর্তমানে সারা দেশে নিবন্ধিত খামার প্রায় ৭০ হাজার আর অনিবন্ধিত খামার প্রায় এক লাখ। ব্রিডার ফার্ম, হ্যাচারি, মুরগির খাবার তৈরির কারখানার মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে। পোলট্রি শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে লিংকেজ শিল্প, কাঁচামাল ও ওষুধ প্রস্তুতকারক এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। সামনের দিনে দীর্ঘমেয়াদে বন্ধ থাকলে পোলট্রি শিল্প বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

এ বিষয়ে বিপিআইসিসি সভাপতি ও প্যারাগন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মসিউর রহমান বলেন, গতবারের লকডাউনে আমাদের ২ টাকায় ডিম ও একদিনের বাচ্চা বিক্রি করতে হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একদিনের বাচ্চা মেরে ফেলতে হয়েছে। সেই পরিস্থিতি যাতে তৈরি না হয়, সেজন্য আগে থেকেই মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পোলট্রি খাতের উৎপাদিত পণ্যগুলো বাজারে প্রবেশের সব ধরনের সুযোগ ও সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এ শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত সবাই ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারবেন। আর জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো গেলে বাজারে পণ্যের চাহিদা তৈরি করা সম্ভব হবে।

জানা গেছে, এবার আগে থেকেই নানা উদ্যোগ নেয়া শুরু করেছে মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষক ও খামারি এবং উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত মাছ, দুধ, ডিম ও পোলট্রি পণ্য বাজারজাত করার উদ্যোগ গ্রহণের জন্য সব জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কর্মরত মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। করোনা পরিস্থিতিতে বাজারজাত সংকটে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত উৎপাদক, খামারি ও উদ্যোক্তাদের কথা মাথায় রেখে এবং ভোক্তাদের প্রাণিজ পণ্য প্রাপ্তির চাহিদা বিবেচনা করে এ নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। ৬ এপ্রিল বিদ্যমান করোনা পরিস্থিতিতে সরকার ঘোষিত চলমান নিষেধাজ্ঞাকালে মাছ, হাঁস-মুরগি, গবাদি পশু, দুধ, ডিম, মাছের পোনা, মুরগির বাচ্চা, পশু চিকিৎসা সামগ্রী, টিকা, কৃত্রিম প্রজনন সামগ্রী, মত্স্য ও পশু খাদ্য, ওষুধ ইত্যাদি পরিবহন এবং বিপণন কার্যক্রম নিশ্চিতকরণ বিষয়ে মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় আয়োজিত ভার্চুয়াল সভায় সারা দেশের মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের ভ্রাম্যমাণ বিক্রয় চালুর নির্দেশ দেয়া হয়।

এ বিষয়ে সেদিন মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম জানিয়েছেন, আমরা সবকিছু বন্ধ করে দিলে মানুষের মাছ, মাংস, দুধ ও ডিমের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে না। আবার উৎপাদক, খামারি, বিপণনকারীসহ এ খাতসংশ্লিষ্ট অন্যরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গত বছর এ খাতের সংকট উত্তরণে ভ্রাম্যমাণ বিক্রয় ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল, কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে, পরিবহনের বাধা দূর করা হয়েছে। বন্দরে মত্স্য ও প্রাণী খাদ্য ছাড়করণেও আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। এ বছরও প্রান্তিক খামারিদের উৎপাদিত পণ্য ভ্রাম্যমাণ বিক্রির ব্যবস্থা করতে হবে। ভ্রাম্যমাণ বিক্রির জন্য জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করার জন্য সভায় সংশ্লিষ্ট মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের তত্পর থাকার নির্দেশ দেন তিনি।

গত বছর করোনা সংকটে মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা মূল্যের খামারিদের উৎপাদিত মাছ, মাংস, দুধ ও ডিম ভ্রাম্যমাণ ব্যবস্থায় বিক্রি করা হয়েছিল। এবারো যদি সেই ধরনের ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয়, তাহলে এ শিল্পের ক্ষতি অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।

এ বিষয়ে আফতাব বহুমুখী ফার্মস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু লুেফ ফজলে রহিম খান শাহরিয়ার বলেন, পোলট্রি খাতে নিয়োজিতদের প্রায় ৪০ শতাংশই নারী। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট মাংসের ৪৫ শতাংশই আসছে পোলট্রি খাতের মাধ্যমে। গ্রামীণ অর্থনীতির রূপান্তর, নারীর ক্ষমতায়নের পাশাপাশি গ্রামীণ উদ্যোক্তা গড়ে তুলতে বড় ভূমিকায় এখন পোলট্রি খাত। ফলে সামনের দিনে দীর্ঘমেয়াদে বন্ধ থাকলে এ শিল্পে চরম বিপর্যয় নেমে আসবে। তাই বিকল্প পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে এ শিল্প রক্ষায় উদ্যোগ প্রয়োজন।

নিউজটি শেয়ার করুন


এ জাতীয় আরো খবর..