রবিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২১, ০৭:৫৩ পূর্বাহ্ন

প্রকৃতির টানে প্রকৃতির কন্যা জাফলংয়ে নাঙ্গলকোট প্রেসক্লাবের সাংবাদিকরা

মো. দুলাল মিয়া, নাঙ্গলকোট (কুমিল্লা) প্রতিনিধি:
  • আপডেট টাইম : রবিবার ৭ নভেম্বর, ২০২১
  • ১৫২
পাহাড় নদী , ঝর্ণা আর পাথর মিলিয়ে প্রাক্রতিক মায়াজাল বিছিয়ে রেখেছে বিছানা কান্দি নাঙ্গলকোট প্রেসক্লাবের সাংবাদিকরা।

ছয় ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। ঋতুর রাজ্যে সময় এখন হেমন্তকাল। হেমন্তকে বলা হয় ঋতুর কন্যা। আর হেমন্ত মানেই শিশিরস্নাত প্রহর ও শীতের পূর্বাভাস। কখনো গরম আবার কখনো ঠান্ডা। এরই মাঝে নিজ মনকে একটু আনন্দ দিতে প্রকৃতির টানে সৌন্দর্যের লীলাভূমি সিলেট বিছানাকান্দি, রাতারগুল, সাদা পাথর ও প্রকৃতির কন্যা জাফলং ঘুরে এলো কুমিল্লার নাঙ্গলকোট প্রেসক্লাবের সাংবাদিকরা।

বিছানা কান্দি:
গত ২ নভেম্বর মঙ্গলবার সকালে সিলেটে রেল স্টেশন থেকে পুরো দিনের জন্য মাইক্রোবাস ভাড়া করে সিলেট শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার সড়কের দেড় দু’ঘন্টার আকাঁ বাকাঁ গ্রামের সড়ক ধরে গোয়াইনঘাট উপজেলার হায়দারপাড়া বাজারে গিয়ে পৌঁছি। সড়কের দুপাশে মাঠের পর মাঠ। চোখজোড়া প্রকৃতিক দৃশ্য। পরে হায়দারপাড়া থেকে ৫-৮ মিনিট পায়ে হেঁটে নদীর ঘাটে গিয়ে ইঞ্জিন চালিত নৌকা ভাড়া করে চলে যাই রুস্তমপুর ইউপির বিছানা কান্দি গ্রামে। যা ভারতের সীমান্তবর্তী খাসিয়া পাহাড়ের মেঘালয়ের সুউচ্চ ঝর্ণা। ওখানে গিয়ে দেখি ঝর্ণা পানি পাথরের উপর দিয়ে বয়ে চলা স্বচ্ছ জলধারা আর পাহাড়ে পাহাড়ে শুভ্র মেঘের উড়াউড়ি। এ যেন এক পাথরের বিছানা। আর স্বচ্ছ পানিতে গা এলিয়ে দিতেই যে আসে মানসিক প্রশান্তি। পাহাড় নদী , ঝর্ণা আর পাথর মিলিয়ে প্রাক্রতিক মায়াজাল বিছিয়ে রেখেছে বিছানা কান্দি। সেখান থেকে নৌকায় করে পুনরায় হায়দারপাড়া বাজারে গিয়ে দুপুরের খাবার খাই।

রাতারগুল:
পরে হায়দারপাড় বাজার থেকে মাইক্রোবাস রওনাদি রাতারগুল জীববৈচিত্র্য জলাবনের উদ্দেশ্যে। যা পৃথিবীর ২২টি মিঠাপানির জলাবনের মধ্যে বাংলাদেশের একমাত্র বন রাতারগুল। সেটিও গোয়াইনঘাট উপজেলার গোয়াইন নদীর তীরে অবস্থিত। সড়কের সেই আঁকা বাঁকা পথ ধরে রাতারগুল টিকেট কাউন্টারে যাই। ২৬০০ টাকায় তিনটি নৌকা ভাড়া করে ১৪ জন সাংবাদিক রাতারগুল বনের বিতরে ডুকি। নৌ পথ ধরে পুরো বনে গুরা গুরি করি। যদি নিদিষ্ট স্থান ছাড়া পানি নেই কোথাও। প্রায় দু’ঘন্টা বনের বিরত ফটোসেশন ও বিভিন্ন ধরনের গান গাই। তখন মনে পড়ে কবি জীবনানন্দ দাশের সেই ভাষা, ‘অঘ্রাণ এসেছে আজ পৃথিবীর বনে সে সবের ঢের আগে আমাদের দুজনের মনে হেমন্ত এসেছে তবু।’

পৃথিবীর ২২টি মিঠাপানির জলাবনের মধ্যে বাংলাদেশের একমাত্র বন রাতারগুল জীববৈচিত্র্য জলাবনে নাঙ্গলকোট প্রেসক্লাবের সাংবাদিকরা।

পরে রওয়ানা হই সিলেট শহরের উদ্দেশ্যে। তখন পশ্চিম আকাশের সূর্য ডুব ডুব। এরিমধ্যে সারাদিনের ঘুরাঘুরিতে সবাই একটু ক্লান্ত। মাইক্রো বাসেই ঘুম এসে যায় আমার। শহরে ডুকার একটু আগে মোবাইল ফোন বেজে উঠল। ঘুম থেকে জেগে উঠি দেখি অচেনা একটি নাম্বারে কল আসছে। কলটি রিসিভ করি হ্যালো কে? আমার বিপরীত দিক থেকে বল, ভাই আমি জাকির হোসেন। আমার বাড়ি নাঙ্গলকোট উপজেলা হেসাখাল বাজারে পাশে। আপনারা কি সিলেট আসছেন। তখন উত্তরে আমি বলাম জ্বি আসছি। তখন তিনি আবার বলেন, আমি জাফলংয়ে থাকি। আপনার কি জাফলং ঘুরে আসবেন। আমি বলাম না এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তখন তিনি বলেন সাংবাদিক রিয়াজ ভাই আছে আপনার পাশে। জ্বি আছে, উনাকে দেন। তখন তিনি রিয়াজ ভাইকে একটু রিকোয়েস্ট করলেন জাফলং আসার জন্য। আর তখনি মনে মনে সিদ্ধান্ত হয় পরের দিন ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর ও জাফলং যাওয়ার জন্য।

সিলেট জেলার পুলিশ সুপার ফরিদ উদ্দিনের সঙ্গে নাঙ্গলকোট প্রেসক্লাবের সাংবাদিকদের মত বিনিময় সভা।

এরি ফাঁকে প্রেসক্লাব সভাপতি মজিবুর রহমান মোল্লার নিকট ফোন আসলো সিলেট জেলার পুলিশ সুপার ফরিদ উদ্দিনের সঙ্গে দেখা করতে। তিনি কুমিল্লা জেলার আমাদের পাশ্ববর্তী চৌদ্দগ্রাম উপজেলার কৃতি সন্তান। তিনি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। তাহার সঙ্গে দেখা করি। এলাকার খোঁজ খবর নিয়ে আলোচনা হয়। সেখান থেকে পরে পাঁচ ভাই হোটেলে গিয়ে রাতের খাবার শেষ করে সড়ক ও জনপদ বিভাগের গেস্ট হাউজে আমাদের জন্য ৪টি রুম বরাদ্দ ছিলো। ওখানে গিয়ে রাত্রি যাপন করি। ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে সকালের নাস্তা খেয়ে হযরত শাহ জালাল (রা:) মাজার শরীফ জিয়ারত করে সকাল সকাল মাইক্রোবাসে রওনা হই ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর উদ্দেশ্যে।

সাদা পাথরের দেশ:
সিলেট শহর থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে সীমান্তবর্তী কোম্পানিগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জে অবস্থিত। ওখানে পৌঁছাতে সময় লাগে ২ ঘন্টা। মাইক্রোবাসে করে যেতে আঁকা বাঁকা সড়কের দুপাশে সবুজ ধানক্ষেত আর অন্যদিকে বিশাল জলাভূমি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতেই পৌঁছে যাই কোম্পানীগঞ্জের টুকের বাজার। সেখানে গিয়ে টিকিট কাউন্টার থেকে টিকেট নিয়ে নীল পানির ওপর দিয়ে নৌকায় চড়ে চলে যাই সাদা পাথরের দেশে। গিয়ে দেখি চারপাশে ছড়িয়ে আছে সাদা পাথর। মনে হয় যেন, প্রকৃতি শুভ্র বিছানা বিছিয়ে রেখেছে। মাঝখানে স্বচ্ছ নীল পানি। চারদিকে ঘিরে আছে ছোট-বড় কয়েকটি পাহাড়। তার উপরে যেন আছড়ে পড়েছে মেঘ। এ ছাড়াও চারপাশে আছে সবুজ প্রকৃতি। সব মিলিয়ে প্রকৃতির যেন অপরূপ এক স্বর্গরাজ্য। তখনি মনে পড়ে যায় হেমন্তের এই দিনের কবিতার কথা ‘সবুজ পাতার খামের ভেতর, হলুদ গাঁদা চিঠি লেখে। কোন পাথারের ওপার থেকে আনল ডেকে হেমন্তকে?’ এরিমধ্যে গা বাসি অনেক ডুবা ডুবি করি নীল পানিতে। ওখানে যে কেউই গেলে গোসল করা ছাড়া আসবেই না। প্রায় ২ ঘন্টা অনেক ঘুরাঘুরি ও ফটোসেশন করে রওনা এবার জাফলং উদ্দেশ্যে

কোম্পানিগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জে সাদা পাথরের দেশে নাঙ্গলকোট প্রেসক্লাবের সাংবাদিকরা।

প্রকৃতির কন্যা জাফলং:
সিলেটের ৬২ কিলোমিটার উত্তর পূর্ব দিকে সীমান্তবর্তী গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলং অবস্থিত। এর অপর পাশে ভারতের ডাউকি অঞ্চল। ডাউকি শহরের অঞ্চলের পাহাড় থেকে ডাউকি নদী জাফলং দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। মাইক্রো ড্রাইভারকে বলাম চলো জাফলং। ওখানে গিয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে নিবো সবাই। ভোলাগঞ্জ থেকে প্রায় ৩ ঘন্টা বাসে বসে বসে আঁকা বাঁকা সড়কের দুপাশে সবুজ ধানক্ষেত, চা বাগান আর অন্যদিকে বিশাল জলাভূমি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতেই পৌঁছে যাই প্রকৃতির কন্যা জাফলংয়ে। তখন সময় ৩.৪৫ মিনিট। আমাদের রিসিভ করেন আগের দিনের দাওয়াত দেয়া স্থানীয় ব্যবসায়ী জাকির হোসেন ভাই। ওখানে স্থানীয় একটি হোটেল দুপুরের খাবার নিয়।

হেমন্তের ঋতু কন্যা আর জাফলং প্রকৃতির কন্যা নাঙ্গলকোট প্রেসক্লাবের সাংবাদিকরা।

হেমন্তকাল মানে ঋতু কন্যা আর জাফলং মানেই প্রকৃতির কন্যা। হেমন্তের পড়ন্ত বিকেল বেলায় দেখি খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত জাফলং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি। যদিও পানি নেই, পিয়াইন নদীর তীরে স্তরে স্তরে বিছানো পাথরের স্তূপ জাফলংকে করেছে দৃষ্টিনন্দন।
সীমান্তের ওপারে ইনডিয়ান পাহাড় টিলা, ডাওকি পাহাড় থেকে অবিরাম-ধারায় প্রবহমান জলপ্রপাত, ঝুলন্ত ডাউকি ব্রিজ, পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ হিমেল-পানি, উঁচু পাহাড়ে গহীন অরণ্য ও শুনশান নীরবতার কারণে আমাদের দারুণভাবে মোহাবিষ্ট করে। এসব দৃশ্যপট দেখে মনোমুগ্ধ হই। এদিকে সূর্য পশ্চিম আকাশে ডুবে গেছে। মাগরিবের আজান শেষে হয়েছে। এবার রওনা হলাম হযরত শাহ পরান (রাঃ) মাজার শরীফ করার উদ্দেশ্যে। ওখানে মাজার শরীফ জিয়ারাত করে সিলেট রেল স্টেশন গিয়ে একটি হোটেলে রাতের খাবার খেয়ে উদয়ন ট্রেণে উঠি। পরের দিন ভোরে লাকসাম রেল স্টেশনে নেমে নাঙ্গলকোট আসি।

নিউজটি শেয়ার করুন


এ জাতীয় আরো খবর..