রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২১, ১২:৩৯ পূর্বাহ্ন

প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর দুই মাসেও কার্যকর হয়নি নীতিমালা

অর্থনীতি ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার ১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২১
  • ৩৮ বার পঠিত

স্বাস্থ্যসেবা ও গবেষণা বরাবরই অবহেলিত ছিল দেশে। বাজেটেও এতদিন গবেষণা খাতে সরাসরি উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ রাখা হয়নি। তবে এবার করোনা সংক্রমণের মধ্যেই চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেন অর্থমন্ত্রী। প্রথমবারের মতো এ বাজেটে সমন্বিত স্বাস্থ্যবিজ্ঞান গবেষণা ও উন্নয়নে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। যদিও এ অর্থ ব্যয়সংক্রান্ত নীতিমালায় প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন দেয়ার পর দুই মাস পেরিয়ে গেলেও তা কার্যকর করতে পারেনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ভবিষ্যতে করোনার মতো মহামারী মোকাবেলা করা যাতে সহজ হয়, সেজন্য গবেষণার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এজন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ গবেষণাসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করে গবেষণা কার্যক্রমের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, উপকারভোগী, কারা এ তহবিল থেকে অর্থ পাবে, গবেষণা কার্যক্রম ব্যবস্থাপনাসহ অন্যান্য বিষয় নির্ধারণ করে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। এ নীতিমালায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্মতিও দিয়েছেন। এরপর গত ৯ ডিসেম্বর এটি বাস্তবায়নে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। এরপর দুই মাস পেরিয়ে গেলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. মজিবুর রহমান বলেন, এ তহবিল বাস্তবায়নে স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে সচিবের সভাপতিত্বে একটি সভা হয়েছে। সভার সিদ্ধান্তসহ রেজল্যুশন উপস্থাপন করা হয়েছে। এটিতে স্বাক্ষর হলে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

নীতিমালাটি বাস্তবায়নে এত দেরি হচ্ছে কেন?—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এ তহবিলে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। সেখানে করোনা নিয়েও গবেষণা হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে এটা এমন নয় যে বাজারে গেলাম আর কিনে নিয়ে এলাম। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ বিভাগ যে নীতিমালা করে দিয়েছে, সেখানেও অনেক সমস্যা রয়েছে। অর্থছাড়ের ক্ষেত্রেও জটিলতা রয়েছে। অর্থ তো আগে এ বিভাগে নিয়ে আসতে হবে। সেটাও একটা সিদ্ধান্তের বিষয়।

অর্থ বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা সব পক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে নীতিমালাটি চূড়ান্ত করেছি। সে নীতিমালা প্রধানমন্ত্রী অনুমোদনও করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে এ-সংক্রান্ত সামারি পাঠানোর আগে আমরা একাধিকবার চেক করেছি। তার পরও কিছু গ্যাপ থাকতেই পারে। কিন্তু জাতীয় বৃহত্তর স্বার্থে এগুলো দ্রুত পূরণ করে গবেষণা কার্যক্রম শুরু করা প্রয়োজন।

অর্থ বিভাগের চূড়ান্ত খসড়া নীতিমালায় বলা হয়, দেশে চিকিৎসাবিজ্ঞানের মৌলিক ও প্রায়োগিক গবেষণার অবকাঠামো তৈরি ও গবেষণা কার্যক্রম প্রবর্তন করা সরকারের লক্ষ্য। গবেষণালব্ধ জ্ঞান দেশের স্বাস্থ্য, স্বাস্থ্য-শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, অনুজীব বিদ্যা, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদির সার্বিক উন্নয়নে ব্যবহার করতে চায় সরকার। স্বাস্থ্য খাতের নতুন উদ্ভাবনের সক্ষমতা তৈরির বিষয়টিতেও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

এছাড়া নতুন ওষুধ, ভ্যাকসিনসহ চিকিৎসায় প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা এবং চিকিৎসার উত্কর্য সাধন; গবেষণা এবং সরকারের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে নলেজ ট্রান্সলেশন অ্যান্ড এক্সচেঞ্জকে উৎসাহ দান ও এর মাধ্যমে এভিডেন্স বেজড গবেষণার ফলাফল স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে কাজে লাগানো। পাশাপাশি চিকিৎসাবিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়ন সাধন এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতাও এর অন্যতম লক্ষ্য।

নীতিমালায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রাদুর্ভাব বেশি এমন রোগসহ নতুন বা সম্ভাব্য রোগব্যাধি ও ভাইরাস বিষয়ে সমন্বিত গবেষণা উৎসাহিত করা হবে। মৌলিক ও প্রায়োগিক গবেষণার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে নির্বাচিত অন্য কোনো স্টাডির জন্যও এ তহবিলের অংশবিশেষ গবেষণা অনুদান হিসেবে বরাদ্দ প্রদান করা যাবে। বিবেচ্য তহবিলের অর্থ অনুদান হিসেবে জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের আওতায় বিভিন্ন বিষয়: করোনাভাইরাস, চিকুনগুনিয়া, ইবোলা ভাইরাস ডিজিজ, জিকা ভাইরাস, নিউরোলজিক্যাল অ্যান্ড মেন্টাল ডিজঅর্ডারস অ্যান্ড ডিজিজেস, নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ, ট্রমা ও ইনজুরি, এপিডেমিওলজিক্যাল স্টাডিজ, বিষয়ভিত্তিক ক্লিনিক্যাল স্টাডিজ, হেলথ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন স্টাডিজ, বায়োমেডিকেল, ফিজিওথেরাপি, ফার্মেসি, নিউট্রিশন, নার্সিংসহ সময় সময় প্রয়োজনের নিরিখে অন্যান্য জনস্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণা কার্যক্রমে বরাদ্দ দেয়া হবে। এ তহবিলের অর্থে মৌলিক গবেষণাকর্ম সম্পাদনের জন্য প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে গবেষক বা গবেষণা প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা হবে।

উপকারভোগীর বিষয়ে নীতিমালায় বলা হয়, নতুন রোগ শনাক্তকরণ ও রোগ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় মৌলিক উদ্ভাবন এবং চিকিৎসা ক্ষেত্রে গবেষণালব্ধ জ্ঞান প্রয়োগে রোগী ও সেবা প্রার্থীরা উপকৃত হবেন। জটিল রোগ উপশমের গবেষণাভিত্তিক কার্যকর ও নতুন চিকিৎসা পদ্ধতির উদ্ভাবনে গণমানুষের উপকার হবে। এছাড়া গবেষণার ফলাফল থেকে রোগতত্ত্ব ও রোগ নিয়ন্ত্রণ, জনস্বাস্থ্য এবং চিকিৎসা প্রযুক্তি বিষয়ে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরা নতুন ধারণা পাবেন।

বাস্তবায়ন কৌশলের বিষয়ে বলা হয়, সমন্বিত স্বাস্থ্য বিজ্ঞান গবেষণা ও উন্নয়ন তহবিলের অর্থ কীভাবে কাকে বরাদ্দ দেয়া হবে, গবেষক বা গবেষণা প্রতিষ্ঠান নির্বাচন পদ্ধতি কী হবে, কোন কোন ক্ষেত্রে গবেষণার অর্থ ব্যয় হবে তা নির্ধারণের জন্য বর্ণিত নীতিমালায় ‘জাতীয় কমিটি’ ও ‘কারিগরি কমিটি’ নামে দুটি আলাদা কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

১১ সদস্যবিশিষ্ট জাতীয় কমিটির সভাপতি হিসেবে দেশের প্রখ্যাত নিউরো বিশেষজ্ঞ ডা. কাজী দ্বীন মোহাম্মদকে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়াও কমিটিতে স্বাস্থ্য বিজ্ঞান বা জনস্বাস্থ্য গবেষণায় দক্ষ, পেশাদার ও প্রতিষ্ঠিত বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক চিকিৎসকদের অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে আরো বলা হয়, প্রস্তাবিত জাতীয় কমিটিকে প্রাথমিকভাবে কমপক্ষে তিন বছর কাজ করার সুযোগ দেয়া যথাযথ হবে। পরবর্তী সময়ে কমিটির কর্মদক্ষতা ও ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে এর মেয়াদ বৃদ্ধি কিংবা কমিটি পুনর্গঠন করা যেতে পারে।

এছাড়া স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের অতিরিক্ত বা যুগ্ম সচিবের (প্রশাসন অনুবিভাগ) সভাপতিত্বে গঠিত কারিগরি কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ কমিটি প্রাপ্ত গবেষণা প্রস্তাবগুলো প্রাথমিকভাবে যাচাই-বাছাই করবে। এ কারণে সাত সদস্যবিশিষ্ট এ কমিটিতে স্বাস্থ্য বিজ্ঞান বা গবেষণায় দক্ষ, পেশাদার ও প্রতিষ্ঠিত বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডাক্তারদের অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, এতদিন পর্যন্ত নীতিমালাটি চূড়ান্ত করতে না পারাটা লজ্জার। করোনার মতো নানা রোগ আসতে পারে। এজন্য আমাদের গবেষণা দরকার। বিদেশে বহু বাঙালি গবেষক বসে আছেন। গবেষণায় সরকার বিনিয়োগ করলে তারা ফিরে আসবেন।

নিউজটি শেয়ার করুন


এ জাতীয় আরো খবর..