সোমবার, ১৯ এপ্রিল ২০২১, ০২:২৭ পূর্বাহ্ন

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় পাল্টে যাবে ওয়াসার সেবা

অর্থনীতি ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার ৪ জানুয়ারী, ২০২১
  • ১৯৫ বার পঠিত

ঢাকা ওয়াসা ছিল একটি সাবেকি প্রতিষ্ঠান। অনিয়ম, দুর্নীতি ও নানা রকম জটিলতায় আক্রান্ত। গ্রাহকসেবার জায়গাটা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। প্রতিষ্ঠানটির একেকটি বিভাগ ছিল এক ধরনের কাজ না জানা মানুষে ভর্তি। এককথায় বললে একটি অকেজো প্রতিষ্ঠান। ২০০৯ সালে একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসে ধীরে ধীরে ওয়াসাকে আধুনিকতম প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করলেন। সব অনিয়ম দূর করলেন। আধুনিক পৃথিবীর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এগিয়ে নিতে লাগলেন ওয়াসাকে। তিনি প্রকৌশলী তাকসিম এ খান।

গতকাল রবিবার বহুমাত্রিক এই কর্মবীরের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে মিলিত হয়েছিলেন কালের কণ্ঠ’র নিজস্ব প্রতিবেদক।

কালের কণ্ঠ : খ্রিস্টীয় নতুন বছরের শুভেচ্ছা। কেমন আছেন?

তাকসিম এ খান : আল্লাহ অনেক ভালো রেখেছেন। এই করোনার সময় ভালো থাকাটাই তো বড় কথা।

কালের কণ্ঠ : ওয়াসা নিয়ে জানতে চাই…

তাকসিম এ খান : ওয়াসা হচ্ছে সরকারের মালিকানাধীন একটি করপোরেট বডি এবং কমার্শিয়াল করপোরেট বডি। ১৯৯৬ সালের ওয়াসা আইন দ্বারা পরিচালিত। সংসদে পাস করা হয় আইনটি। সেই আইনের আওতায় ওয়াসা প্রতিষ্ঠিত। ওয়াসার দুটি বৈশিষ্ট্যের মধ্যে একটি হচ্ছে চেম্বার বোর্ড, অন্যটি হচ্ছে ম্যানেজমেন্ট। সরকার এখানে মালিক মাত্র। বোর্ড ও ম্যানেজমেন্টের ব্যাপারে সরকারের সরাসরি তদারকি নেই। যে কারণে এটি একটি স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান। আইন হওয়ার পরও সরকারির মতোই চলছিল প্রতিষ্ঠানটি। পরিবর্তনটা আসে ২০০৯ সালে। আইনটির বিষয়ে সাবেক চিফ জাস্টিস খায়রুল হক খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা বলেছেন। তিনি বলেছিলেন, ‘এই আইনটি কখন করল?’ আমি বললাম, ১৯৯৬ সালে। এরপর তিনি জানতে চাইলেন, তখন সরকারে কে ছিল? আমি বললাম, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার। তিনি হেসে বললেন, একমাত্র বঙ্গবন্ধুকন্যার পক্ষেই এটা সম্ভব। সরকারের মালিকানাধীন এমন কোনো সংস্থা নেই, যার ব্যবস্থাপনার বিষয় সংস্থাপন মন্ত্রণালয় ছাড়া অন্য কেউ করতে পারে। এই আইনে লেখা আছে, ওয়াসার কাঠামো ও সেটআপ করবে বোর্ড। কারো কাছে যেতে হবে না। এ ছাড়া সরকারি ও আধাসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের বেতনকাঠামো অর্থ মন্ত্রণালয় ছাড়া ঠিক করা যায় না। এখানে বোর্ড ঠিক করতে পারবে। এ এক অসাধারণ সিদ্ধান্ত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষেই সম্ভব। এই হচ্ছে ওয়াসা।

কালের কণ্ঠ : ওয়াসার অতীত এবং পরিবর্তিত বর্তমানকে ছাপিয়ে প্রতিষ্ঠানের সেবা কোথায় নিয়ে যেতে চান?

তাকসিম এ খান : ওয়াসার পরিবর্তন অনেক হয়েছে। তবে এর পেছনে অনেক ইতিহাস আছে। ওয়াসা আইন পাস হওয়ার পর ততটা পরিবর্তন আসেনি। কারণ ২০০১ সালে সরকার পরিবর্তন হওয়ার পর আইন থাকলেও অনেকটা সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতোই সব কিছু চলতে লাগল। ২০০৯ সালে আমি দায়িত্ব পাওয়ার পর ওয়াসার আমূল পরিবর্তনের কথা চিন্তা করে একটি কর্মসূচি হাতে নিলাম—‘ঘুরে দাঁড়াও ঢাকা ওয়াসা’। ভাবলাম তখনকার পরিস্থিতিতে কিছুই পরিবর্তন হবে না। তখনো আমাদের সব চলত দিন এনে দিন খাইয়ের মতো। কোনো সঠিক পরিকল্পনা ছিল না। তখন আমি একটি ভিশন ঠিক করলাম। সাউথ এশিয়ার মধ্যে আমাদের পানি ব্যবস্থাপনা হবে পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও গণমুখী। পরিবেশ ধ্বংস করে আন্ডারগ্রাউন্ড পানি আর না। যে জন্য আমাদের সার্ফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট করতে হবে। এ জন্য টাকা ও প্রযুক্তি দুটিই প্রয়োজন। দুটির সমন্বয় হলেই তা সম্ভব। এরপর টেকসইয়ের বিষয়টি হচ্ছে স্থায়ীভাবে পানির সমাধান। এখন ৮০০ পাম্প আছে, কয়েক বছর পর তো লাগবে এক হাজার ৬০০ পাম্প। এ রকম বিভিন্ন সমস্যা তো রয়েছেই।

কালের কণ্ঠ : ওয়াসার তিনটি মাস্টারপ্ল্যান হাতে নেওয়া হয়েছিল। এগুলোর অগ্রগতি কতটুকু?

তাকসিম এ খান : তিনটি আলাদা পরিকল্পনার মধ্যে ওয়াটার মাস্টারপ্ল্যানের কাজ শেষ হয়েছে, যার সুফল গ্রাহকরা পেতে শুরু করেছেন। পয়োনিষ্কাশন ও ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যানের মধ্যে পয়োনিষ্কাশনের কাজ শুরু হয়ে গেছে। মোটকথা ওয়াসা সঠিক পথেই এগিয়ে যাচ্ছে এবং নিজেদের সক্ষমতার শতভাগ সেবা দিচ্ছে।

কালের কণ্ঠ : করোনার মধ্যেও শতভাগ সেবা দেওয়ার জন্য আপনাদের উদ্যোগগুলো কেমন ছিল?

তাকসিম এ খান : দেশে যখন ৮ই মার্চ প্রথম করোনা শনাক্ত হলো তখন ৯ই মার্চ থেকেই আমরা একটা সচেতনতামূলক প্রগ্রাম হাতে নিলাম। কারণ আমরা তো জানি, ঢাকা ওয়াসা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এর সঙ্গে প্রায় দুই কোটি মানুষের সেবার বিষয় জড়িত। তাই সব কিছু বন্ধ থাকলেও আমরা সেবা বন্ধ করতে পারব না। তখন আমরা আমাদের স্টাফদের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচার করলাম যে লকডাউন হলেও আমাদের অফিসে আসতে হবে, কাজ করতে হবে। ২৬ মার্চ সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির মধ্যেও আমরা কাজ করেছি। তখন খুব ভালোভাবে আমরা আমাদের সার্ভিস দিয়ে যেতে পেরেছি। কোনো সমস্যা হয়নি। এক দিনের জন্যও কাজ বন্ধ হয়নি। আমাদের প্রায় চার হাজার কর্মীর মধ্যে করোনা আক্রান্ত হয়ে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে শতাধিক। যারা পজিটিভ হয়েছে তাদের সব সময় খোঁজখবর নেওয়াসহ সব ধরনের সহায়তার চেষ্টা করা হয়েছে।

কালের কণ্ঠ : গত বছর দুর্নীতি ঠেকাতে আপনারা একটি শুদ্ধি অভিযান কমিটি গঠন করেন এবং ওয়াসার সব অফিসে বিজ্ঞপ্তি টাঙানোর ব্যবস্থা করেন। তাতে কতটা পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে করেন?

তাকসিম এ খান : আমরা জিরো টলারেন্সটা খুব কঠোরভাবে মানার চেষ্টা করছি। সম্প্রতি বিভিন্ন পর্যায়ে ছোটখাটো যে বিষয়গুলো ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে, সেগুলো নিয়ন্ত্রণে আনার জন্যও কাজ করছি, যাতে কোনোভাবেই অবৈধ অনৈতিক কাজে ওয়াসার কেউ জড়িত হতে না পারে। একটা বিষয় মাথায় রাখা খুব জরুরি, দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে শুরুতেই জানতে হবে দুর্নীতি কেন হয়? কিভাবে হয়? যখন সেটি চিহ্নিত করা যাবে তখন কাজটা অনেক সহজ হয়ে যাবে। আমি সবাইকে একসঙ্গে ডেকে দুর্নীতি থেকে দূরে থাকতে বলতে পারি। তাতে ১ শতাংশ মানুষ পরিবর্তন হলো। তারপর বেতন বাড়িয়ে দিয়ে বলা হলো, দুর্নীতি করবেন না। আরো ১০ শতাংশ মানুষ ঠিক হলো। কিন্তু মূল থেকে পরিবর্তন করতে চাইলে উল্লিখিত প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করতে হবে। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। তবেই মূল থেকে পরিবর্তন হবে।

কালের কণ্ঠ : ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ওয়াসার ট্রেনিং সেন্টার। তার মাধ্যমে ওয়াসার সেবাসহ সার্বিক দিক পরিবর্তনের জন্য কাজ করার কথা। এ নিয়ে আপনার ভাবনা কী?

তাসকিম এ খান : সম্প্রতি আমাদের একটি বড় কাজের মধ্যে আছে ঢাকা শহরের ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক পরিবর্তন করে ডিস্ট্রিক্ট মিটার এরিয়া (ডিএমএ) করা। আমরা একটা ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক চালু করেছি। ১৪৪টি ডিস্ট্রিবিউটর এরিয়া ভাগ করেছি। এর মধ্যে ৬৪টির কাজ শেষ হয়েছে। যে কারণে ওই সমস্ত এলাকায় আমাদের সিস্টেম লস ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। এ অবস্থা টোকিও ছাড়া সাউথ এশিয়ার কোথাও নেই। ওটাকেই আমরা এখন টেকসই করছি, যাতে করে আর বেড়ে না যায়। এসব করতে গিয়ে আমরা অনেকের কাছে অনুকরণীয় হচ্ছি। ভারতের বিভিন্ন শহর থেকে ট্রেনিং নিতে আসছে। আমাদেরকেও এই বিষয়ে জানানোর জন্য গেস্ট হিসেবে নিয়ে যাচ্ছে, ‘ঘুরে দাঁড়াও ঢাকা ওয়াসা’ কর্মসূচির মাধ্যমে যে অর্জন করেছি সে বিষয়ে জানতে। সে কারণে এখন আমরা ঢাকা ওয়াসা ইন্টারন্যাশনাল ট্রেনিং অ্যান্ড রিসার্চ একাডেমির কাজ শুরু করেছি। বর্তমানে পানি নিয়ে কাজ করা ইন্টারন্যাশনাল কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে। আমাদের একাডেমিতে যারা ট্রেনিং করবে, তাদের আন্তর্জাতিক সনদ প্রদান করা হবে। দেশের ওয়াসাসংশ্লিদের ট্রেনিং দেওয়ার পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার আগ্রহীদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশ অংশ নিতে পারবে।

কালের কণ্ঠ : পানির লাইনের জন্য আবেদনের পর সব ধরনের শর্ত পূরণ হলে সহজে লাইন পাচ্ছে গ্রাহক। এই প্রক্রিয়া আরো সহজ ও কম সময়ে করার চিন্তা করছেন?

তাকসিম এ খান : আমাদের সব ধরনের সেবা এখন ডিজিটাল পদ্ধতিতে হচ্ছে। পানির সংযোগ দেওয়াকেও এখন আমরা ই-কানেকশন বলছি। ম্যানুয়ালি কারো আসার দরকার নেই। আমাদের চেষ্টা মানুষের ছোঁয়া ছাড়া সেবা দিয়ে যাওয়া। আমাদের বড় একটি অর্জন হচ্ছে, দেশে প্রথম রিয়েল টাইম অনলাইন পেমেন্ট পদ্ধতি চালু করা। এখন অনেকেই করে। আমাদের এত পদ্ধতির মধ্যে একটা বিষয় এখনো ম্যানুয়ালি আছে। সেটি হচ্ছে, মিটার রিডিংটা। ওটা কোনো ব্যক্তিকে গিয়ে করে আসতে হয়। সে দেখে এলে পরে সেটি কম্পিউটারে ইনপুট করলে বাকি কাজ কম্পিউটারে হয়। এমনকি বিল প্রিন্ট, বিল জেনারেট করাসহ এসএমএস দেওয়া এবং ব্যাংকে টাকা জমা দিলে এসএমএসের মাধ্যমে সেটি গ্রাহককে জানিয়ে দেওয়া, সমস্ত বিষয় অটোমেটিক। মিটার দেখার বিষয়টিও পরিবর্তন করার চেষ্টা করছি, যাতে কারো দেখতে না হয়। তরঙ্গের মাধ্যমে মিটার রিডিং সংগ্রহের বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে। এ জন্য চারটি কম্পানি আমাদের সঙ্গে কাজ করছে। সেখানে আংশিক সফলতা পাওয়া গেছে। পুরোপুরি সফল হলে আমাদের বিলিং হবে কোনো মানুষের হাতের ছোঁয়া ছাড়া।

কালের কণ্ঠ : নতুন বছরে ওয়াসার গ্রাহকদের জন্য কী সুখবর দিতে চান?

তাকসিম এ খান : সবচেয়ে বড় খবর হলো, আমরা ডিজিটাইজ হয়ে ওয়াসাকে সম্পূর্ণ ভিন্নমাত্রায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। গ্রাহককে ওয়াসার কাছে আসতে হবে না। ওয়াসার ডিজিটাল টেকনোলজি গ্রাহকের ঘরে পৌঁছে যাবে। এরপর বলতে পারি, পানির চাহিদা নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। আমাদের হাতে থাকা কাজগুলো শেষ হলে পানির কোয়ালিটি নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকবে না। এখনো পানির কোয়ালিটি শতভাগ রয়েছে। তবে বিতরণে কিছু বিপত্তি ঘটে। যে কারণে বলতে পারি, ৯০ ভাগ ক্ষেত্রে পানি পানযোগ্য থাকে। একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে, আমরা ড্রিংকিং ওয়াটার দিই না। আমরা ব্যবহার উপযোগী পানি দিই।

কালের কণ্ঠ : আমাদের সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

তাকসিম এ খান : কালের কণ্ঠকেও অনেক ধন্যবাদ।

সূত্র: কালের কণ্ঠ

নিউজটি শেয়ার করুন


এ জাতীয় আরো খবর..