শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০, ০৬:৪৬ অপরাহ্ন

বাংলাদেশে করোনার প্রভাব: অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ

নূর আল আহাদ
  • আপডেট টাইম : ১৯ জুন, ২০২০
  • ২৩৩ বার পঠিত

দেশের অর্থনীতি এবং অর্থব্যবস্থা নিয়ে কারো তেমন একটা চিন্তা থাকে না। কিন্তু অর্থনীতির সাথে জনগণের সম্পর্ক অনেক পুরাতন। একটা সময়ে বলা হতো পলিটিকাল ইকোনমি কারণ অর্থনীতির মূলে রয়েছে মানুষজন।

এখন দেখার বিষয় হচ্ছে দুর্যোগকালীন মুহূর্তে অর্থনীতি কেমন কাজ করে। পৃথিবীব্যাপী একটি চলমান মহামারী হচ্ছে করোনা। করোনার কারণে অর্থনীতির উপর প্রভাব পড়ছে এই রকম অনেক রকমের আলোচনা আমরা খুব ভালোই শুনছি ইদানিং। কিন্তু দেখার বিষয় হচ্ছে আসলে অর্থনীতির কোন খাতের উপর করোনার কেমন প্রভাব পড়ছে।

আমাদের দেশের অর্থনীতির তিনটি মূল খাত হচ্ছে কৃষি, শিল্প এবং সার্ভিস। এখন একটু বিস্তারিতভাবে দেখা যাক অর্থনীতির কোন খাতে কেমন প্রভাব পড়েছে করোনাকালীন বিশেষ করে সাধারণ ছুটিকালীন সময়ে।

১। কৃষি :

কৃষিখাতের উপর করোনার প্রভাব আসলে সঠিক করে নিরুপন করা হয় নি আজও। বেশকিছু দিক রয়েছে কৃষিখাতের যেগুলোর দিকে নজর দেয়া গুরুত্বপূর্ণ –
কৃষিঋণ : অনেক কৃষক আছে যাদের ঋণ নিয়ে কৃষি কাজ করতে হয়। সেই ক্ষেত্রে তাদেরকে কিছু ঋণ মওকুফের চিন্তা করা যেতে পারে।
তারপরও অর্থনৈতিকভাবে আসলে কেবল ঋণ মওকুফ করলেই কৃষকের কষ্ট শেষ হয় না বরং আরো কিছু সাপোর্ট লাগে।

কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য : আমাদের দেশের কৃষিপণ্যের যে সাপ্লাই চেইন তাতে আসলে কৃষিপণ্য বিক্রয় করে কৃষকের তেমন একটা লাভ হয় না। বরং এই ধরণের সাপ্লাই চেইন থেকে বেশি লাভবান হয় তৃতীয় পক্ষ। অপরদিকে, ক্রেতারা কিন্তু ন্যায্যমূল্যের থেকে বেশি দামে জিনিস কিনতে বাধ্য হন।

শ্রমের অপ্রতুলতা : করোনার এই সময়ে কৃষিকাজ পরিচালনার জন্য যে পরিমান শ্রমের প্রয়োজন তা থেকে কমই পাওয়া যাচ্ছে কারণ জীবনের ভয় সবার মধ্যেই কমবেশি কাজ করে।

কৃষকের ব্যয় : যে কোনো কৃষিকাজে কৃষকের অনেক ধরণের ব্যয় থাকে যেমন বীজ কেনার খরচ, সারের খরচ, পরিবহন খরচ, শ্রমের পারিশ্রমিক , বিদ্যুৎ বিল ইত্যাদি।
যাই হোক না কেন এই ব্যয়গুলো কিন্তু কৃষককে বহন করতে হয়। তাহলে বলা যায় যে, কৃষিখাতের উপর করোনার ভালোই প্রভাব পড়েছে।

২। উৎপাদন খাত :

আমাদের দেশের উৎপাদন খাতের মধ্যে মূলত রয়েছে শিল্প-কারখানার উৎপাদন। বিশেষ করে আমাদের দেশের গার্মেন্টস শিল্পের কথা এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যেতে পারে।

গতবছর থেকেই নানা রকম খবর এসেছে আমাদের গার্মেন্টস শিল্পকে নিয়ে। গার্মেন্টস শিল্পের মার্কেট আমাদের জন্য দিন দিন সংকোচিত হচ্ছে কারণ আমাদের থেকেও আজকাল চীন এবং ভিয়েতনামে কম খরচে উৎপাদনের সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

আবার করোনার সময়ে কিন্তু বাইরে থেকে যে পরিমান অর্ডার আমাদের পাবার কথা ছিল তার থেকে কমই অর্ডার দেয়া হয়েছে। এমনকি কিছু কিছু অর্ডার বাতিল করার কথাও শোনা গিয়েছে।

এমন অবস্থায় আসলে কেবল করোনার কারণেই গার্মেন্টস শিল্পের অবনতি তা সঠিকভাবে বলার কোনো সুযোগ নেই। বরং বলা যায় যে বিগত দিনগুলোর সবগুলোর বিষয়ের সমষ্টি মিলেই আজ গার্মেন্টস শিল্পের এই অবস্থা।

এমন অবস্থায় যদিও অনেকে মনে করেছেন গার্মেন্টস খুলে দিলে ভালো হবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে গার্মেন্টস খুলে দেয়ার পর এখন যে রকমভাবে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে তাতে ভালো করেই বলা যায় যে আগামীতেও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়বে। এই সংখ্যার মধ্যে গার্মেন্টস শিল্পের কর্মীরাও থাকতে পারে।

তাহলে কর্মীর সংখ্যা কম হলে বরং গার্মেন্টস শিল্প ঠিকমতো ডেডলাইন মিট করতে না পারার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে করে অর্ডার বাতিলও হতে পারে।
আবার দেশে যদি অনেক মানুষ আক্রান্ত হয় তবে হাইজিন বিষয়টি চিন্তা করেও কিন্তু অর্ডার বাতিল হতে পারে। এমন অবস্থায় আসলে গার্মেন্টস শিল্পগুলোকে নিজেদেরই ঠিক করতে হবে পরিবর্তিত পরিস্থিতে কি করবেন তারা।

৩। সার্ভিস খাত :

আমাদের সার্ভিস খাতের মধ্যে রয়েছে ফিনান্সিয়াল প্ৰতিষ্ঠানগুলো। করোনাকালীন সময়ে কিন্তু ব্যাংকগুলো চালুই ছিল যদিও সীমিত আকারে। তবে লেনদেন কিছুটা কম ছিল কারণ দুর্যোগকালীন পরিস্থিতি। এখন ব্যাংকের মুনাফার কিন্তু তেমন হেরফের হয় নি এই করোনা থেকে কারণ ব্যাংক মুনাফা অর্জন করে ঋণ দেয়ার মাধ্যমে।

আমাদের তো এমনিতেও বিগত দিনগুলোতে কয়েক কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রয়েছে। ব্যাংকিং সেক্টর এই বিষয়গুলো সাথে নিয়েই চলছে।

বরং এই খাতে মূল সমস্যা ছিল স্টক মার্কেটকে নিয়ে যা বন্ধ ছিল। কিন্তু যাই হোক না কেন স্টক মার্কেট সব সময় চালু থাকতেই হবে। তবে দেশে এখনো পুঁজিবাজার এবং অর্থনীতির মধ্যে একদম হেড টু হেড সম্পর্ক আজও তেমন করে নেই। তিনটি খাত দেখার পর মনে হচ্ছে কৃষিখাতই বেশি কষ্টে পড়েছে এই করোনার কারণে।

তবে বেশকিছু খাতের উন্নয়নও হয়েছে যেমন অনলাইন ব্যবসায়, ভিন্নধর্মী স্টার্টআপ, হেলথ কেয়ার সেক্টর, আইটি সেক্টর ইত্যাদি খাতে আয়ের পরিমান বেড়েছে কারণ মানুষজন এরকম খাতগুলোর সেবা কিংবা প্রোডাক্টগুলো বেশি ব্যবহার করছে।

দিন শেষে অর্থনীতির বোঝা সাধারণ মানুষের মাথায় পড়েছে কারণ সাধারণ মানুষের আয় বাড়েনি বরং অনেকেই অর্ধেক কিংবা কম বেতন পেয়েছে কিংবা কারো কারো চাকরি চলে গিয়েছে। অনেক পরিবারে আবার পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যুর কারণে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিয়েছে।

মধ্যবিত্তদের অবস্থা আরো করুন। তারা কাউকে কিছু বলেন না কারণ তাদের মধ্যে আত্মসম্মান প্রবল। এমন অবস্থায় অনেক মধ্যবিত্তই মানবেতর জীবনযাপন করেছেন।

তাই যাবতীয় অর্থনৈতিক প্রণোদনার মুলে সবার আগে মানুষকে প্রাধান্য দেয়া উচিত। যদিও বেশকিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল তবে মোটামুটি দুর্নীতি এবং অব্যবস্থাপনা কারণে এই উদ্যোগগুলো তাদের ফল দেখাতে মোটের উপর ব্যর্থ হয়েছে।

এছাড়াও কৃষি এবং মানুষের পর আরো একটি ক্ষতিগ্রস্থ খাত হলো ক্ষুদ্র শিল্পগুলো এবং স্টার্টআপ।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এদের অর্থের সংকট প্রবল। পাশাপাশি বাজারও কিছুটা সীমিত তাই এদেরকেও প্রণোদনা দেয়া প্রয়োজন কারণ এরাই আগামীতে অর্থনীতির ভিত আরো মজবুত করবে। পুরো লকডাউন কিংবা কারফিউ আমাদের দেশে পুরোপুরি সফল যদি সম্পূর্ণ আর্মি নিয়ন্ত্রিত হয় এবং পাশাপাশি বিতরণের যাবতীয় কাজ তাদের মাধ্যমে করা হয়।

মানে এক্ষেত্রে সরাসরি সরকার টু সাধারণ জনগণ পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে এবং এর মাঝে সাহায্যকারী হিসেবে থাকবে আর্মি। করোনাকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। তাই অন্য দেশগুলোর মতো আর্মি ব্যবহার করে করোনাকে দমন করতে হবে।

কারণ করোনা সংক্রমণ যত বাড়বে ততই দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথ রুদ্ধ হবে। আর করোনা যদি বেশিদিন থাকে তাহলে অর্থনীতি ভেঙে পড়বে। করোনার যে চাপ তা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে কিন্তু দেশের অর্থনীতি এবং স্বাস্থ্য খাতের উপর খুব ভালো করেই পড়ছে। আক্রান্তদের সুস্থ করে তোলার যে ব্যয় তা ২ থেকে ৪ মাস পূর্ণরূপে লক ডাউনের ব্যয় থেকেও বেশি।

লেখকঃ
নূর আল আহাদ
বিবিএ (ইউনিভার্সিটি অফ ঢাকা, বাংলাদেশ)
এমবিএ (ইউনিভার্সিটি পুত্রা মালয়েশিয়া, মালয়েশিয়া)
মাস্টার অফ ইঞ্জিনিয়ারিং (ফিনান্সিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং, জাপান)
ফিনান্সিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং গবেষক (জাপান)

নিউজটি শেয়ার করুন


এ জাতীয় আরো খবর..