শনিবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২১, ০৫:১১ অপরাহ্ন

মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়ার দেখানো পথ ও বর্তমান নারী সমাজের চিত্র

সিলভিয়া আক্তার
  • আপডেট টাইম : বুধবার ৯ ডিসেম্বর, ২০২০
  • ২২০ বার পঠিত

নারী তুমি মায়ের জাতি কিন্তু তোমাকে মনে রাখতে হবে, তুমি মেয়ে মানুষ। নারী তুমি আজ সমাজের সকল স্তরে অবদান রাখছো কিন্তু ভুলে যেওনা, তুমি একজন মেয়ে মানুষ। সমাজের পরিবর্তনেরর ধারায় আজও নারীদের প্রতিটি পদক্ষেপে শুনতে হয়- ‘তুমি মেয়েমানুষ’।

জন্মলগ্ন থেকে এই একটি কথা দিয়েই একজন নারীকে বুঝিয়ে দেওয়া হয় যে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তার চলার পথ সংকীর্ণ। চাপিয়ে দেওয়া হয় নানান নিয়মকানুন। লিঙ্গবৈষম্যের কঠিন শিকলটি তার হাতে পায়ে পড়িয়ে দেওয়া হয়।

নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (জন্ম ৯ডিসেম্বর ১৮৮০- মৃত্যু ৯ডিসেম্বর ১৯৩২)। আজ নারীদের শিক্ষার অধিকার পাওয়ার পেছনে তার রয়েছে অসামান্য ভূমিকা। তিনি মুসলিম নারী সমাজে শিক্ষার আলো নিয়ে এসেছিলেন। নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আর লিঙ্গসমতার জন্য লড়াই করে গিয়েছেন।

পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীদের অসম অবস্থান তিনি তার রচনার দ্বারা সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন এবং সমাজে নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও পুরুষশাসিত সমাজ থেকে নারীদের মুক্তির পথ দেখিয়েছেন। নারীদের স্বাধীন ভাবে বাহিরে চলাফেরার অধিকার ও স্বাধীন চিন্তাচেতনার অধিকারের যৌক্তিকতা তিনি তার রচনা ও কর্মের দ্বারা দেখিয়েছেন। নারীদের শিক্ষার দ্বারা বিকশিত করে নারী-পুরুষ সাম্যের এক সমাজ প্রতিষ্ঠা করাই ছিলো বেগম রোকেয়ার লক্ষ্য। বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের ইতিহাসে তার অবদান চিরস্মরণীয়। এই মহীয়সী নারীকে স্মরণ রাখতে তার জন্মদিনটিকে প্রতিবছর রোকেয়া দিবস (৯ডিসেম্বর) হিসেবে পালন করা হয়।
নারীরা আজ শিক্ষিত হচ্ছে। পাচ্ছে পুরুষের সাথে সমান তালে কাজ করার সুযোগ। দেশের সব ক্ষাতেই তাদের অংশগ্রহণ দৃশ্যমান হচ্ছে। চার দেওয়ালের মাঝে আর বন্দী নেই তারা। দেশের উন্নয়ন নারীদের ব্যতীত সম্ভবও নয়। আমাদের দেশের সংবিধানেও নারীদের অধিকার স্বীকৃত রয়েছে।

কিন্তু আমরা যতই মুখে বলি না কেন, নারী পুরুষ সমান বা সংবিধানে যতই নারী পুরুষের সমান অধিকার স্বীকৃত হোক না কেন, কোথাও না কোথাও আজও নারীরা অবহেলিত। সমাজের একটি অংশ আজও নারীদের শুধু ভোগ্যপণ্য হিসেবেই বিবেচনা করে। যার দরুন প্রতিনিয়ত টিভি বা খবরের পাতায় দৃশ্যত হয় নারী নির্যাতনের খবর। ছোট শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধা অথবা মানসিক ভারসাম্যহীন নারী কেউ বাদ পড়ছে না কিছু নরপিশাচের নোংরা দৃষ্টি থেকে। ধর্ষিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। রাস্তাঘাটে চলাফেরা করতে গিয়ে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে সর্বত্র তাদের হেনস্তা হতে হয়। এই দেশে একটা দিনও বাদ যায়না যেদিন কোনো ধর্ষণের ঘটনা পত্রিকার পাতায় প্রকাশ হয় না। প্রতিনিয়তই দেখতে হয়- ধর্ষণের পর শিশুহত্যা, শিক্ষকের দ্বারা শিক্ষার্থী ধর্ষিত, নিজ পিতার দ্বারা কন্যার ধর্ষণ, পুত্রবধূকে ধর্ষণের অভিযোগ, মর্গে মৃত নারীকে ধর্ষণ, বাসে ধর্ষণের পর হত্যা ইত্যাদি। ধর্ষণ এখন আমাদের দেশে একটি সাধারণ চিত্র। অন্যদিকে ধর্ষণের জন্য নারীকেই দায়ী করা হয়। গৃহবন্দী থাকলে তারা নিরাপদ, ঘরের বাহিরে স্বাধীনভাবে চলাচল করলেই ধর্ষিত হতে হবে, দোষ নারীদের চলাফেরার, তাদের পোশাকের।
প্রাচীনকাল থেকেই নারীর উপর পুরুষের আধিপত্য কায়েম হয়েছে। বর্তমান সমাজের কিছু মানুষ আজও মনে করে নারীরা সবকিছুতেই অযোগ্য। বিয়ের সময় যৌতুক দিতে না পারলে শ্বশুর বাড়িতে নির্যাতিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত; নারীকে বিচার করা হচ্ছে তার রূপ দিয়ে, চরিত্র বা কর্ম দিয়ে নয়; স্ত্রী সুন্দরী হলে স্বামীরা দেখছেন সন্দেহের চোখে, কুৎসিত হলে স্বামীরা মাতেন পরকীয়ায়। কিছু কিছু পরিবারে আজও দেখা যায় কন্যাশিশু জন্ম নিলে তাকে অভিশাপ মনে করে হত্যা করছে অথবা ফেলে দিচ্ছে নর্দমায়। আবার কন্যাশিশু জন্ম নিলে সেখানেও দায়ী করা হচ্ছে শিশুর মা’কেই অর্থাৎ নারীকে। এসব সহ্যশক্তির বাহিরে চলে গেলে নারী বেছে নিচ্ছে আত্মহত্যার পথ।

সমাজের উন্নতির মূলে যেমন পুরুষের অগ্রণী ভুমিকা রয়েছে ঠিক একইভাবে নারীরও ভূমিকা রয়েছে। নারী সমাজের উন্নয়নের সাথে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলে শুধু একটি সমাজ বা দেশ নয় গোটা বিশ্বের উন্নয়ন সম্ভব। শান্তি বিস্তার সম্ভব। সামাজে নারীদের নিয়ে ইতিবাচক চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি তৈরী করতে হবে। তাদের অবস্থান আরো শক্ত করতে হবে। তাদের সাথে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের বিচার সুনিশ্চিত করতে হবে। নারীদের যেনো দিনে অথবা রাতে চলাচল করতে পুরুষের উপর নির্ভর করতে না হয়। পুরুষের নোংরা দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, সচেতনতা, সুযোগ, নিরাপত্তা, শিক্ষা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। তবেই একটি সুষ্ঠ স্বাভাবিক সমাজ গড়ে উঠবে।

লেখকঃ শিক্ষার্থী, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

নিউজটি শেয়ার করুন


এ জাতীয় আরো খবর..