শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০, ০২:২৪ অপরাহ্ন

সৌদি নয়, পাকিস্তান কাছে চাইছে চীনকেই

আব্বাস আলী
  • আপডেট টাইম : ৩০ আগস্ট, ২০২০
  • ৯৩ বার পঠিত

রুপান্তরঃ আব্বাস আলী। ঝিনাইদহ।
সুত্রঃ বিভিন্ন গণমাধ্যম ও আল জাজিরা
রবিবার , ৩০ আগষ্ট ২০২০

মুসলিম বিশ্বে সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র পাকিস্তান। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক সবদিক দিয়েই তারা একে অপরের পাশে রয়েছে বহুদিন ধরে। কিন্তু হঠাৎই যেন ফাটল ধরেছে দুই দেশের পুরোনো বন্ধুত্বে! সৌদি নেতৃত্বাধীন ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) থেকে বের হয়ে যাওয়া তো বটেই, বরং সমমনাদের নিয়ে আলাদা জোট গড়ার হুমকি দিয়েছে পাকিস্তান। পাল্টা জবাবে পাকিস্তানকে দেয়া ১০০ কোটি ডলারের সুদমুক্ত ঋণ সুবিধা তুলে নিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি। কিন্তু কী নিয়ে এত দ্বন্দ্ব? কোন স্বার্থে ভাঙতে বসেছে দুই দেশের মিষ্টি-মধুর সম্পর্ক?

চলতি মাসের শুরুর দিকে ভারতশাসিত কাশ্মীর ইস্যুতে ওআইসির বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তোলে পাকিস্তান এবং দাবি পূরণ না হলে তাদের পাশ কাটিয়ে নতুন জোট গড়ার হুমকি দেয় দেশটি।

গত ৪ আগস্ট পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কোরেশি টেলিভিশনে এক বক্তব্যে বলেন, ‘আমি ওআইসিকে আবারও শ্রদ্ধার সঙ্গে বলছি, পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের একটি সম্মেলনই আমাদের প্রত্যাশা। আপনারা যদি তা আহ্বান করতে না পারেন তবে আমি প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে কাশ্মীরের বিষয়ে আমাদের পাশে দাঁড়াতে এবং নিপীড়িত কাশ্মীরিদের সমর্থন করতে প্রস্তুত ইসলামী দেশগুলোকে নিয়ে বৈঠক ডাকতে বলতে বাধ্য হবো।’

গত বছর আগস্টে ভারতশাসিত কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর থেকেই প্রতিবেশী দেশটির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমর্থন জোগাড়ের চেষ্টা করছে পাকিস্তান।

ইসলামাদের এমন প্রকাশ্য হুমকিতে স্পষ্টতই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে মুসলিম বিশ্বে সৌদি আরবের নেতৃত্ব। ইউনাইটেড স্টেটস ইনস্টিটিউট অব পিস (ইউএসআইপি)-র সিনিয়র ফেলো সিরিল আলমিডা বলেন, ‘এটি অসাধারণ এবং নজিরবিহীন ঘটনা। সৌদি-পাকিস্তান সম্পর্কে এধরনের কিছু আগে কেউ কখনোই দেখেনি।’

পাকিস্তানের দেয়া চ্যালেঞ্জ অবশ্য মুখ বুজে সহ্য করে থাকার পাত্র নয় সৌদি আরব। দ্রুতই তারা পাকিস্তানকে তাদের দেয়া ১০০ কোটি ডলারের সুদমুক্ত ঋণ প্রত্যাহার করে। পাশাপাশি তেলের মূল্য দেরিতে পরিশোধযোগ্য একটি বিশেষ স্কিম নবায়নেও অস্বীকৃতি জানায় রিয়াদ। ফলে অনেকটা বাধ্য হয়ে অথবা ভূরাজনৈতিক কৌশল হিসেবে চীনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে সৌদি আরবের ঋণ পরিশোধ করে পাকিস্তান।

দুই দেশের মধ্যে হয়েছে কী?পাকিস্তানের জন্য অর্থনৈতিক এবং সৌদির জন্য ভূরাজনৈতিক কারণে দুই দেশের সম্পর্ক বেশ গুরুত্বপূর্ণ। গত বছর এ দু’টি দেশের মধ্যে ১৭০ কোটি ডলারেরও বেশি বাণিজ্যিক লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ৭৪ শতাংশই হয়েছে সৌদি থেকে পাকিস্তানের তেল আমদানির বিনিময়ে। পাকিস্তান তাদের চাহিদার প্রায় এক-চতুর্থাংশ তেলই আমদানি করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি থেকে।

এছাড়া, সৌদিতে কাজ করছেন অন্তত ২৫ লাখ পাকিস্তানি প্রবাসী, যাদের পাঠানো রেমিটেন্স পাকিস্তানের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দুই দেশের সামরিক সম্পর্কও বেশ শক্তিশালী। সৌদির চাহিদা মোতাবেক বিভিন্ন সময়ে প্রয়োজনীয় সৈন্য পাঠায় পাকিস্তান।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ব্রুকলিন ইনস্টিটিউটের বৈদেশিক নীতি বিষয়ক ফেলো মাদিহা আফজাল বলেন, ‘পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক সৌদি আরবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া সৌদির ধর্মীয় শক্তি ও প্রভাবের ক্ষেত্রেও বড় জায়গা রয়েছে পাকিস্তানি জনসংখ্যার। পাকিস্তান সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং সৌদি আরব তাদের নিজেদের পাশে রাখতে চায়। তবে ওআইসিকে পাশ কাটিয়ে সম্মেলন আহ্বানের হুমকি মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বে সৌদি আরবের অবস্থান সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।’

যদিও ওআইসির বাইরে পাকিস্তানের নতুন জোট গঠনের প্রচেষ্টা এটাই প্রথম নয়। গত ডিসেম্বরেই কুয়ালালামপুরে পাকিস্তান, সৌদির অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী তুরস্ক এবং ওআইসি-বিরোধী মুসলিম দেশগুলোর শীর্ষ নেতাদের নিয়ে সম্মেলনের আয়োজন করেছিল মালয়েশিয়া। তবে সৌদির আপত্তির মুখে শেষমুহূর্তে সম্মেলনে যোগ দেয়া থেকে বিরত থাকেন পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান।

শুধু ওআইসির নিষ্ক্রিয়তা নিয়েই নয়, চিরশত্রু ভারতের সঙ্গে সৌদির সাম্প্রতিক দহরম মহরম সম্পর্ক নিয়েও আপত্তি রয়েছে পাকিস্তানের। ২০১৯ সালে ইসলামাবাদ সফরে গিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে বিভিন্ন প্রকল্পে প্রায় দুই হাজার কোটি ডলারের চুক্তিতে সই করেন সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। তবে কিছুদিনের মধ্যেই ভারত সফরে যান তিনি এবং সেখানে ১০ হাজার কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগের ঘোষণা দেন।

সংকট থেকে উত্তোরণের চেষ্টাবেশ কিছু ইস্যুতে মতবিরোধ তৈরি হলেও পুরোনো মিত্রকে কে হারাতে চায়? সুতরাং শীতল সম্পর্ক ফের উষ্ণ করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে সৌদি-পাকিস্তান।

গত ১৭ আগস্ট সৌদি আরব সফরে যান পাকিস্তানের চিফ অব আর্মি স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া। যদিও সেখানে দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে শুধু রুটিনমাফিক আলোচনা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

এর কিছুদিন পরেই ওআইসির ভূয়সী প্রশংসা করে এক বিবৃতি দিয়েছে পাকিস্তানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এছাড়া দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীও আগের বক্তব্য থেকে প্রায় ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘ওআইসি কাশ্মীর নিয়ে অনেক নীতি পাস করেছে, তাদের মধ্যে কোনও অস্পষ্টতা নেই। তারা পাকিস্তানের অবস্থানের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।’

সৌদির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি আজ স্পষ্ট করে বলতে পারি, কাশ্মীরের বিষয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদি আরবের কোনও মতপার্থক্য নেই।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তানের নতুন এই অবস্থানে সম্পর্কের বরফ হয়তো গলতে পারে। তবে ইতোমধ্যেই যে ক্ষতি হয়ে গেছে, তার দাগ থেকে যাবে বহুদিন।

নিউজটি শেয়ার করুন


এ জাতীয় আরো খবর..