মঙ্গলবার, ২৪ মে ২০২২, ০৯:৩৮ অপরাহ্ন

বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস ২০২২: কুষ্ঠ আক্রান্ত ব্যক্তিদের সঠিক তথ্য ও শিক্ষা প্রদান করতে হবে

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৯ জানুয়ারী, ২০২২

দেশের করোনা মহামারীর এই পরিস্থিতির মধ্যেই বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস ২০২২ পালিত হচ্ছে আজ।প্রতি বছর জানুয়ারি মাসের শেষ রোববার বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস হিসেবে পালন করা হয়। সে হিসাবে এ বছর জানুয়ারি মাসের ৩০ তারিখে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১০০টি দেশে কুষ্ঠরোগের বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে এই দিবস পালন করা হয়।আর এই দিবসের উদ্দেশ্য হলো কুষ্ঠ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা এবং এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সাহায্য করা।

জনবিচ্ছিন্ন কুষ্ঠ আক্রান্ত ব্যক্তিদের সমাজে পুনঃগ্রহণ, সর্বপ্রকার কুষ্ঠজনিত কুসংস্কার দূরীকরণ, এই সকল লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে জনসাধারণ এবং কুষ্ঠ আক্রান্ত ব্যক্তিদের সঠিক তথ্য ও শিক্ষা প্রদান করাই হচ্ছে এই দিবসের লক্ষ্য। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক কুষ্ঠবিরোধী সংগঠনসমূহের আন্তর্জাতিক ফেডারেশন ‘আইলেপ’, যা ১৩টি আন্তর্জাতিক এনজিও এর সমন্বয়ে গঠিত, এই দিবসটি পালনে উদ্যোগ নেয়।আইলেপ এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা রাউল ফোলেরো বিশ্বব্যাপী কুষ্ঠরোগ বিষয়ক ব্যাপক সচেতনতা বৃদ্ধি কল্পে ও কুষ্ঠরোগের প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য ১৯৫৪ সালে দিবসটি উদযাপনের জন্য উদ্যোগ নিয়েছিলেন।আজকের বিষয় নিয়ে কলাম লিখেছেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট গবেষক ও জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা ডা.এম এম মাজেদ তাঁর কলামে লিখেন…কুষ্ঠ রোগের নাম শুনলে আজও আতঙ্ক ছড়ায়। কারও এমন রোগ হয়েছে শুনলে আজও অনেকে সেই ব্যক্তির চারপাশে ঘেঁষতে চান না, এড়িয়ে থাকেন। কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক যন্ত্রণা তো থাকেই, পাশাপাশি ওই ব্যক্তি ও তার পরিবারকে নানারকম সামাজিক এবং মানসিক সমস্যায় পড়তে হয়। মানসিক এই জন্য, কারণ কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি অনেক ক্ষেত্রে অচ্ছূত হিসেবে গণ্য হন। এই রোগের কারণে ত্বক ক্ষতিগ্রস্থ হয়, ত্বকে পচন ধরে। তাই কুষ্ঠ রোগীকে অনেকে ঘেন্না করে। কিন্তু মনে রাখা দরকার কুষ্ঠ কোনও পাপ নয় এবং এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি অপরাধী নন। কুষ্ঠ একটি জীবাণুবাহিত সংক্রামণ। প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত এবং উপযুক্ত চিকিৎসায় এই রোগ সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব। তাই মানুষের মধ্যে এই বিষয়ে সঠিক জ্ঞান থাকা জরুরি।আর কুষ্ঠ মানব ইতিহাসের সবচেয়ে পুরোনো রোগগুলোর মধ্যে অন্যতম। পৃথিবীর তিনটি প্রধান ধর্ম, যথা- হিন্দু, খ্রিস্টান ও ইসলাম ধর্মের পবিত্র গ্রন্থগুলোতে এ রোগের উল্লেখ আছে। পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতার লীলাভূমি হিসেবে পরিচিত মিসর, চীন, গ্রিক, রোম, ভারত ইত্যাদি প্রায় সব কটি দেশের ইতিকথায় এর বিবরণ পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, এ রোগের ইতিহাস চার হাজার বছরের পুরনো। এ রোগের সবচেয়ে পুরনো কংকাল-নির্ভর প্রমাণ মেলে ভারতবর্ষে, যা প্রায় খ্রিষ্টপূর্ব দুই হাজার সালের সময়কার। তবে, রোগটির সাথে মানুষের পরিচয় কয়েক হাজার বছর আগের হলেও, এর প্রকৃত কারণ তাদের জানা ছিল না। তেমনি এর কোনো চিকিৎসাও তাদের জানা ছিল না। ফলে, শত সহস্র বছর ধরে এ রোগকে কেন্দ্র করে চলে আসে নানাবিধ অলীক ধারণা ও কুসংস্কার, যার নির্মম শিকার হয়ে সমাজে যুগের পর যুগ, বছরের পর বছর নিপীড়িত, নিগৃহীত হয়েছে এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা। কোথাও এটাকে মনে করা হয়েছে বিধাতার অভিশাপ, কোথাও বা পাপাচারের ফসল। এ রোগের কার্যকারণ বা প্রতিকারের বিষয়ে তেমন কিছু না জানলেও লোকজন এটুকু বুঝতে পেরেছিল যে, এ রোগ ছোঁয়াচে, জন থেকে জনান্তরে ছড়াতে পারে। ফলে, সমাজের স্বার্থপরতার বলি হয়ে আক্রান্ত ব্যক্তিকে হতে হয়েছে অস্পৃশ্য, কোথাও সমাজচ্যুত, এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে লোকালয় থেকে নির্বাসিত। আধুনিক বিজ্ঞানের কল্যাণে আজ আমরা কুষ্ঠের কারণ, এর উপসর্গ ও ক্রমধারা সম্পর্কে সম্যক ওয়াকিবহাল। এর কার্যকর চিকিৎসাও আমাদের আয়ত্তে। এক্ষেত্রে মাইলফলক ছিল ১৮৭৩ সালে নরওয়ের বিজ্ঞানী গেরহার্ড হ্যানসেনের যুগান্তকারী আবিষ্কার। এই কৃতী বিজ্ঞানী গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণ করেন, কুষ্ঠ আসলে একটি জীবাণুঘটিত রোগ, যা একটি ধীরলয়ে বংশ বিস্তার করা ব্যাকটেরিয়ার কারণে ঘটে। এই ব্যাকটেরিয়াটি আজ আমাদের কাছে মাইকোব্যাকটেরিয়াম লেপ্রে নামে পরিচিত। সেই থেকে এ রোগটিও হ্যানসেনস ডিজিজ নামে পরিচিতি লাভ করে।আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, প্রতি লাখে পাঁচজন বা তার অধিক কুষ্ঠ রোগী পাওয়া গেলে তাকে উচ্চ ঝুঁকি বলতে হবে।জাতীয় কুষ্ঠ রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি সূত্র মতে, ১৯৮৫ সালে ৫২ হাজার ১৬১ জন রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাদের মধ্যে ৩৬ শতাংশ ছিল প্রতিবন্ধী। ২০১১ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১০ শতাংশে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে প্রতি ১০ হাজার জনগোষ্ঠীর মধ্যে নথিভুক্ত কুষ্ঠ রোগীর হার একজনের নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করে। কয়েক বছর ধরে দেশে গড়ে প্রায় চার হাজার নতুন কুষ্ঠ রোগী শনাক্ত হচ্ছে। ২০১৮ সালে দেশে তিন হাজার ৭২৯ জন এবং গত বছর তিন হাজার ৬৩০ জন নতুন করে কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হয়েছে। ২০১৯ সালে কুষ্ঠ রোগী শনাক্ত হয়েছিল তিন হাজার ৬৩৮ জন। ২০২০ সালে নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে দুই হাজার ৭১৯ জন।আমাদের দেশে সাম্প্রতিক সময়ে প্রতি বছর প্রায় ৩৫০০ কুষ্ঠ রোগী শনাক্ত হচ্ছে এবং এর মধ্যে প্রায় ৪০০ রোগী সময়মতো ও সঠিক চিকিৎসার অভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে যাচ্ছে।গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০৩০ সালের মধ্যে দেশকে কুষ্ঠমুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন।
আর ২০১৫ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট কুষ্ঠ রোগীর ৬০ শতাংশ রয়েছে ভারতে। তারপরেই রয়েছে ব্রাজিল-১৩ শতাংশ। কুষ্ঠ রোগীর সংখ্যা অনুপাতে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম।
এ অনুযায়ী এই ১২ জেলা কুষ্ঠ রোগের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। এগুলো হলো- রংপুর বিভাগের রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নীলফামারী ও গাইবান্ধা। রাজশাহী বিভাগের জয়পুরহাট, খুলনা বিভাগের মেহেরপুর, সিলেটের মৌলভীবাজার এবং পার্বত্য তিন জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান। এসব জেলায় প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে পাঁচজন বা তার অধিক কুষ্ঠ রোগী শনাক্ত করা হয়েছে।

> কুষ্ঠ রোগ কী?
কুষ্ঠ রোগ বা হ্যানসেন রোগ হল মাইকোব্যাক্টেরিয়াম লেপ্রি নামক ব্যাক্টেরিয়ার কারণে সৃষ্ট দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণ। এই ব্যাক্টেরিয়া ত্বকের উপর দ্রুত সংক্রমণ ছড়ায়। তাছাড়াও সংক্রমণটি স্নায়ু, শ্বাস প্রশ্বাসের নালী এবং চোখের ক্ষতি করতে পারে। কুষ্ঠ রোগের কয়েকটি প্রকারভেদ রয়েছে –
* টিউবারকুলার লেপ্রসি
* ইন্টারমিডিয়েট লেপ্রসি
* লেপ্রোমাটাস লেপ্রসি
সাধারণত বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কুষ্ঠ রোগ হাতের চামড়ায় হয়ে থাকে। সংক্রমণের ফলে ত্বকে ক্ষত, স্নায়বিক ক্ষয় এবং শরীর দুর্বল এবং অসাড় বোধ হতে পারে। বাচ্চা থেকে বয়স্ক, যে কোনও বয়সের ব্যক্তি এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে।

> কুষ্ঠ রোগের লক্ষণঃ-
কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে প্রাথমিক যে লক্ষণগুলি দেখা দেয় সেগুলি হল
ত্বকের রঙ পরিবর্তন, ফ্যাকাশে দাগ এবং ছোপযুক্ত ত্বক।
ত্বকের উপর জ্বালা, যন্ত্রণা অনুভব হয় এবং প্রচণ্ড গরম লাগে।
মাংসপেশী দুর্বল হয়ে পড়ে।
হাত ও পায়ে ঘা এবং অসাড় হয়ে যায়।
চুল উঠে যায়।
রুষ্ক ও শুষ্ক ত্বক।
পায়ের পাতার নীচের অংশে ঘা।
নাক বন্ধ এবং নাক দিয়ে রক্ত পড়ে।

> জটিলতাঃ-
মিউটিলেশান * দৈহিক বিকৃতি। * বন্ধ্যাত্ব । * লেপ্রাফিভার । * দেহের আভ্যন্তরীণ যন্ত্রসমূহের ক্রিয়া বিকৃতি ।* শ্বাসকষ্ট যেহেতু নেরিংস এবং ট্রেকিয়া আক্রান্ত । * বার বার মূর্ছাভাব এবং নাক দিয়ে রক্ত স্রাব । * টিউবার কিউলোসিস বা নেফ্রাইটিস । * মিউরাইটিস । *ইরাইটিস এবং ক্ষত ।

> রোগ নির্ণয় এবং পরীক্ষাঃ-
কুষ্ঠরোগের প্রধান তিনটি লক্ষণ >
১। অনুভূতি শক্তি হ্রাস ।
২। দেহের বিভিন্ন স্নায়ু সূত্রগুলো মোটা হয়ে যায়।
৩। দ্রুত অ্যাসিড ব্যাসিলির উপস্থিতি।
এই তিনটির যে কোন একটি অবশ্যই লক্ষণ হিসাবে থাকতে হবে । অ্যাসিড-দ্রুত ব্যাসিলি-স্মিয়ারগুলি একটি নোডিউল, অনুপ্রবেশ করা জায়গা, একটি পাতেহের প্রান্ত এবং অনুনাসিক শ্লেষ্মা ঝিল্লি থেকে নেওয়া উচিত তবে উপাদানটি স্মিয়ার করা হয়েছে নেবার নির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে । এইসব সংগৃহীত দাগযুক্ত উপাদান পরীক্ষার জন্য পাঠালে দেখা যাবে কুষ্ঠরোগের জীবাণু পাওয়া গেছে । নাকের শ্লেষ্মা ঝিল্লি সিরাপ করে নাকের ভিতর থেকে স্মিয়ার নেওয়া উচিত এবং তারপর পরীক্ষার জন্য পাঠাতে হবে । আজকাল পরীক্ষাগার পরীক্ষা দ্বারা এই রোগ চিহ্নিত হয় ।

ইসলামের দৃষ্টিতে কুষ্ঠ রোগের ইতিহাসঃ-

ইসলামের দৃষ্টিতে রোগ হওয়া কোনো অপরাধ নয় এবং রোগীর সেবা করা প্রত্যেকের কর্তব্য। হাদিসে কুদসিতে আছে, হাশরের দিনে বিচারের সময় আল্লাহ তাআলা বলবেন, ‘আমি অসুস্থ ছিলাম, তুমি আমার সেবা করোনি।’ বান্দা বলবে, ‘হে আল্লাহ! আপনি তো অসুস্থ হন না! কীভাবে আপনার সেবা করব?’ আল্লাহ বলবেন, ‘আমার অসুস্থ বান্দারা তোমার পাশে ছিল, তাদের সেবা করলে আমার সেবা করা হতো।’ (মুসলিম)।কাউকে ঘৃণা করা পাপ, অহেতুক সন্দেহ করা অতি জঘন্য মহাপাপ। সঠিক তথ্য না জেনে কথা বলা মিথ্যার শামিল, মিথ্যা হলো পাপের জননী। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, উহার অনুসরণ কোরো না; কর্ণ, চক্ষু, হৃদয়, উহাদের প্রতিটি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।’ (সুরা-১৭ বনি–ইসরাইল, আয়াত: ৩৬)। সুতরাং কোনো আক্রান্ত ব্যক্তির প্রতি অমূলক কুধারণা পোষণ করা যাবে না।

প্রাচীন চিকিৎসকদের মতে, সাত প্রকারের রোগকে সংক্রামক অর্থাৎ ‘ছোয়াঁচে’ রোগ বলা হয়। এ সাত প্রকারের ছোয়াঁচে রোগ হচ্ছে: (১) কুষ্ঠরোগ, (২) খোশ-পাঁচড়া, (৩) বসন্ত, (৪) ফোসা, (৫) চোখের রোগ, (৬) মুখের দুর্গন্ধ, (৭) অবা (তাউন) মহামারী ইত্যাদি।কুষ্ঠরোগীসহ অন্য গুরুতর সংক্রামক রোগীদের হাসপাতালে পৃথক করে রাখার ব্যবস্থা শুরু হয় হিজরি প্রথম শতাব্দীতে (৭০৬-৭০৭ খ্রিস্টাব্দ)। ইসলামের ইতিহাসের উমাইয়া খেলাফতের ষষ্ঠ খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিকের তত্ত্বাবধানে দামেস্কে সর্বপ্রথম হাসপাতাল তৈরি করা হয়। সেখানে কুষ্ঠরোগী ও অন্যান্য সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীদের পৃথক রাখার নির্দেশনা দেন।আর জাহেলী যুগে আরবদের ধারণা ছিল যে, কোনো ব্যক্তি যদি রোগাক্রান্ত হয় তা হলে কোনো সুস্থ ব্যক্তি তার নিকটবর্তী হলে এবং তার সাথে পানাহার করলে, তার মধ্যেও ঐ ব্যক্তির রোগ সংক্রমিত হয়। অর্থাৎ ‘ছোয়াঁচে’ রোগের এ ধারণা ইসলাম পূর্বযুগ থেকেই প্রচলিত। রসূলুল্লাহ (সা.) এর সময়ে কুষ্ঠ রোগের ঘটনা ঘটেছিল। বোখারী শরীফের বরাতে বলা হয়েছে, তিনি বলেছেন, ‘কুষ্ঠ রোগীর কাছ থেকে এমনভাবে পলায়ন কর, যেভাবে তোমরা বাঘ হতে পলায়ন কর।’ ইবনে মাজা’র হাদিসে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ (সা.) একজন কুষ্ঠ রোগীর হাত ধরে একটি দোয়া পাঠ করে তাকে খাবারে শরিক করেন। কুষ্ঠ ও শেতি (ধবল) রোগ সম্পর্কে হজরত ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেন, এটি এবং ধবল উভয় সংক্রামক বা ‘ছোয়াঁচে’ রোগ। তিনি আরো বলেন, কুষ্ঠ রোগীর সন্তানও এ রোগ হতে কম নিরাপদ। পিতার মধ্যে এ রোগ হওয়ার কারণে সন্তানাদির মধ্যেও তা স্থানান্তরিত হয়। এ বক্তব্যের ব্যাখ্যায় ইমাম দামেরী (রহ.) বলেন, ‘কুষ্ঠ ও ধবল মূলত সংক্রামক নয় বরং আল্লাহ তাআলা কর্তৃক এতে আসর বা প্রভাব বিস্তার করার ফলে সংক্রমিত হয়েছে।

কেননা আল্লাহর সুন্নাত বা বিধান প্রচলিত যে, কোনো কোনো সুস্থ নিরাপদ ব্যক্তি যদি কোনো রোগাক্রান্ত ব্যক্তির সাথে অস্বাভাবিক নৈকট্য রাখে অথবা উভয় এক সাথে বসবাস করে, তাহলে দ্বিতীয় ব্যক্তিও তাতে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। অনুরূপভাবে সে সঙ্গী তার সাথে অবস্থানের কারণে জড়িয়ে পড়ে। আর দ্বিতীয় ব্যক্তিও যদি ঐ রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে তখন লোকেরা মনে করে এসব রোগ সংক্রামক। অথচ রসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ইসলামে কোনো সংক্রামক (ছোয়াঁচে) রোগ নেই এবং কোনো অশুভও নেই।’ প্রথমে হুজুর (সা.) এর দুইটি পরস্পর বিরোধী হাদিসের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ দুই’র মধ্যে সমন্বয় সাধন করা হয়েছে। সার কথা হচ্ছে, কুষ্ঠ রোগী হতে দূরে থাকার নির্দেশ সে ব্যক্তির জন্য যে নিজের মধ্যে বিশ্বাস ও ভরসা (একিন ও তাওয়াক্কুল) উচ্চ স্তরের রাখে না, বরং তার ভয় ও আশঙ্কা হয় যে সে কুষ্ঠ রোগীর সাথে উঠা বসা করার দরুন আক্রান্ত হয়েছে। এ ধারণার বশবর্তী হয়ে অর্থাৎ সন্দেহ ও সংশয়ের কারণে শিরকে খফি বা অপ্রকাশ্য শিরক গোনাহের ভাগী হয়ে গেল। এ কারণে শরীয়ত এই বিশ্বাসকে বাতিল করে দেয় যে, একজনের রোগ অন্যের মধ্যে সংক্রমিত হয় অথবা উড়ে গিয়ে পেয়ে বসে, এ কথার কোনো বাস্তবতা নেই বরং প্রকৃতির বিধান এবং আল্লাহর ইচ্ছায়ই এরূপ হয়ে থাকে। কারণ প্রথম ব্যক্তির যেভাবে রোগ হয়েছে, দ্বিতীয় ব্যক্তিরও অনুরূপভাবে হয়ে থাকবে। সুতরাং, শায়খ কেরমানী উল্লেখ করেছেন, রসূলুল্লাহ (সা.)-এর এই কথা বলা যে, সংক্রামণ (ছোয়াঁচে) রোগের কোনো বাস্তবতা নেই, তবে কুষ্ঠ রোগ এর চেয়ে আলাদা।

‘কুষ্ঠ রোগ (ছোয়াঁচে) সংক্রমণ হয়ে থাকে’ শেখ সালাহউদ্দীন ইরাকী হুজুর (সা.) এর একটি উক্তি উদ্ধৃত করেছেন। যাতে বলা হয়েছে যে, ‘ধ্বংসাত্মক কোনো রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি কোনো ব্যক্তির সংস্রবে যাবে না।’ এ হাদিস দ্বারা তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন, যদি কোনো শিশুর মা কুষ্ঠ অথবা ধবল রোগে আক্রান্ত হয়, তাহলে তার জিম্মা হতে (লালন-পালন, দুধ পান করার) অধিকার বাতিল হয়ে যায়। কেননা মায়ের সাথে বসবাস ও দুধ পান করার ফলে শিশুর মধ্যেও কুষ্ঠ ও ধবল রোগ সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে। শাফেয়ী মাজহাবের ইমাম দামেরী (রহ.) বলেন, ইরাকী যা বলেছেন তা অত্যন্ত স্পষ্ট। অতঃপর তিনি হাম্বলি মাজহাবের ইমাম ইবনে তাইমিয়ার এ মতের প্রতি সমর্থনের কথা উল্লেখ করেন এবং মালেকী মাজহাবের সমর্থনের উদাহরণ প্রসঙ্গে বলেন যে, রোগে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তি যদি সুস্থ লোকদের সাথে মোসাফিরখানা অথবা সরাইখানা ইত্যাদিতে থাকতে চায় তাহলে তার প্রতি বাড়াবাড়ি আরোপ করা হবে তবে অধিবাসীরা যদি অনুমতি দেয় তা ভিন্ন কথা।পরিশেষে উপকার ও অপকারের একমাত্র মালিক আল্লাহ তাআলা। হায়াত-মওত, সুস্থতা-অসুস্থতা সবই তাঁর হুকুমে হয়ে থাকে। মোটকথা, সংক্রামক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে রোগাক্রান্ত হওয়া একটি বাস্তব বিষয়। তবে সংক্রমনের এই ক্ষমতা রোগের নিজস্ব নয়; বরং আল্লাহপ্রদত্ত। তাই তিনি চাইলে সংক্রমণ হবে নতুবা হবে না এবং এটি যেহেতু রোগাক্রান্ত হওয়ার একটি বাস্তব কারণ তাই রোগাক্রান্ত হওয়ার অন্যান্য কারণ থেকে বেঁচে থাকতে যেমনিভাবে কোনো দোষ নেই তেমনি এক্ষেত্রেও উপযুক্ত সতর্কতা অবলম্বন করা দোষের নয়। বরং কিছু হাদিসে সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশও দেয়া হয়েছে।

> হোমিও সমাধানঃ-রোগ নয় রোগীকে চিকিৎসা করা হয়,১৮৭৪ খ্রিঃ ডাঃ হ্যানিম্যান এই জীবাণু আবিষ্কার করেন, সর্বাধুনিক পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াহীন সফল হোমিওপ্যাথিক ঔষধ লক্ষণ সদৃশ নির্বাচন করিয়া চিকিৎসা প্রদান করিলে বিনা ক্লেশে অল্প সময়ে রোগটি সম্পূর্ণ আরোগ্য হয়।বিশেষজ্ঞ হোমিওপ্যাথি গন সাধারণত যে সকল ঔষধ কুুুষ্ঠ রোগীর জন্য ব্যবহার করে থাকেন, আর্সেনিক, আর্সেনিক আয়োড, হোয়াংনাম, পাইপার-মেথিষ্টি, ক্যালি-বাই, ব্যাডিয়েগা, চালমোগড়া তেল, হাইড্রোকোটাইল, ল্যাকেসিস, সিপিয়া, সালফার, ব্যাসিলিনাম, হিপার, সাইলিসিয়া, স্কুকুম-চক, কমোক্লেডিয়া, ক্যালোট্রেপিস ইত্যাদি ঔষধ সমূহ । চালমোগড়া মাদার ঔষধটি এই রোগের মহা উপকারী । ইহার বাহ্যিক ও আভ্যন্তরিক প্রয়োগ । ১০০ আউন্স পানি ১ আউন্স কার্বলিক অ্যাসিড মিশিয়ে ঐ পানি আক্রান্ত স্থান ধৌত করলে এবং বাহ্যিক ভাবে চালমোগড়া তেল লাগালে উপকার পাওয়া যায় । গর্জন তেল ও চালমোগড়া তেল মালিশ করলেও উপকার পাওয়া যায় ।ক্যালোট্রেপিস জাইগানটিকা একটি মুল্যবান ভারতীয় ঔষধ । এই ঔষধটি গোদ, কুষ্ঠ এবং তরুণ আমাশয় রোগে খুব ভাল কাজ করে । ইহা চর্মের মধ্যে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করে এবং একটি উৎকৃষ্ট ঘর্মকারক ঔষধ । এমন কি ঘর্মহীনতার লক্ষণ প্রকাশ পায় সেখানে যে কোন রোগে ক্যালোট্রেপিস জাইগানটিকা সহ আরো অনেক মেডিসিন লক্ষণের উপর আসতে পারে তাই ঔষধ নিজে নিজে ব্যবহার নাা করে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।পরিশেষে, আসুন আক্রান্ত ব্যক্তিগণের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলে একত্রে কাজ করি এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে একটি কুষ্ঠমুক্ত দেশ হিসেবে পৃথিবীর মানচিত্রে প্রতিষ্ঠা করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হই।
লেখক, সম্পাদক ও প্রকাশক দৈনিক স্বাস্থ্য তথ্য
প্রতিষ্ঠাতা, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি।

ইমেইল, drmazed96@gmail.com

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত আজকের অর্থনীতি ২০১৯।

কারিগরি সহযোগিতায়: