মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৩৫ অপরাহ্ন

সাবেক ভ্যাট কমিশনার নুরুজ্জামান দুর্নীতির শীর্ষে

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৭ জানুয়ারী, ২০২৫
  • ১৬৫

নিউজটি শেয়ার করুন

পতিত সরকারের দোসর সাবেক ভ্যাট কমিশনার একেএম নুরুজ্জামান চাকরি কালীন সময়ে দুর্নীতিরমাস্টারমাইন্ড ছিলেন। শত অভিযোগে অভিযুক্ত দুর্নীতির শীর্ষে থাকা নুরুজ্জামান টাকার বিনিময়ে তদবির করেসব আমলনামা ধামাচাপা দিয়ে এখনো আয়েশি জীবন যাপন করছেন।

এই ভ্যাট কর্মকর্তা দুদকের ফাইল পর্যন্ত গায়েব করে ফেলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে দুদক সূত্র বলছে, হাজার কোটি টাকার মালিক নুরুজ্জামান তার অবৈধ আয়ের অধিকাংশ টাকা পাচার করেছেন দেশের বাইরে।চাকরি জীবনে গণভবনের সিন্ডিকেট মেইনটেইন করে পোস্টিং নিতেন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়। নুরুজ্জামানেরঘুষের মাত্রা ছিলো বড়ো ধরনের। অর্থাৎ মোটা দাগের টাকা ঘুষ বাণিজ্য ছিলো তার নেশা। ছোট খাটো কোনটাকা তিনি ধরতেননা। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র জনতা আন্দোলন ঠেকাতে সরকারের পক্ষে নগদ টাকা দিয়েসহযোগিতা করার অভিযোগ উঠেছে সাবেক ভ্যাট কমিশনার নুরুজ্জামানের বিরুদ্ধে।

ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা থানাধীন শৈলঢুবি গ্রামে নূরুজ্জামানের বাড়ি হলেও তিনি পরিচয় ব্যবহারকরতেন গোপালগঞ্জের বাসিন্দা। কথায় কথায় নাম বিক্রি করতেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। তাছাড়াসাবেক আইজিপি বেনজির আহমেদ এর নামও ব্যবহার করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি সর্বমহলে এবংডিভিশনে ক্ষমতাধর একজন ভ্যাট কমিশনার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার অধিনস্থ সমসাময়িক এবংঊর্ধ্বতন স্যারদের কাছে ছিলেন শেখ পরিবারের স্বজন হিসেবে পরিচিত। অসাধ্যকে সাধ্য করার ক্ষমতা এবংম্যানেজ মাস্টার হিসেবে পরিচিত লাভ করে ছিলেন একেএম নুরুজ্জামান। বিশেষ করে গণভবনের নাম ব্যবহারকরে বাগিয়ে নিতেন সব তদবির বাণিজ্য। ক্ষমতাধর নুরুজ্জামান সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দপ্তরেরএকজন উপদেষ্টা এবং সাবেক বন পরিবেশ মন্ত্রী প্রয়াত সাজেদা চৌধুরীর সাথে সখ্যতা গড়ে তুলে মামলা সহবিভিন্ন তদবিরের সুবিধা গ্রহণ করেছেন বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। নুরুজ্জামান ২০০৯ সালে কাস্টমসসাউথে থাকা অবস্থায় দেদারসে চাকরি দিয়েছেন এলাকাবাসী এবং আত্নীয় স্বজনদের। ওই সময় নিয়োগেঅনিয়ম ঘুষদুর্নীতির বিষয় টি নিয়ে আলোচনায় আসেন নুরুজ্জামান। সবার কাছে বেশ সমালোচনার মুখেপড়েন। ২০১৩ সালে কমলাপুর আইসিটিতে নিয়োগ বাণিজ্য এবং ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ডছিলেন নুরুজ্জামান। গোপালগঞ্জের দোহাই দিয়ে কোনমতে ওই যাত্রায় বিপদ সামলান। কিন্তু ঘুষ বাণিজ্য বন্ধহয়নি চাকরির শেষ দিন পর্যন্ত।

একটি মামলার নথিপত্র পুড়ে অভিযোগে জানা যায়, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর কয়েকটি স্থলবন্দর থেকে রাজধানীরইসলামপুর নয়াবাজার পর্যন্ত গড়ে ওঠা চোরাই পণ্যের কারবারি সিন্ডিকেটকে অনেক বছর আগ থেকেসহায়তা দিতেন সাবেক ভ্যাট কমিশনার একেএম নুরুজ্জামান। রাজস্ব বিভাগের বন্ড কমিশনারেট শুল্কগোয়েন্দা এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অনুসন্ধানে উঠে আসে তথ্য। কিন্তু ওই সময়েক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে ধামাচাপা দেন।

২০১৭ সালের ২০ আগস্ট পুরান ঢাকার গুলশান আরা সিটি মার্কেটের সামনে কাভার্ড ভ্যান থেকে বিপুলপরিমাণ চোরাই পণ্য উদ্ধার করা হয়। ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় মাসটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের সৈয়দআবিদুল ইসলাম, মিজানুর রহমান খন্দকার সুরাত আলীর বিরুদ্ধে মামলা করে শুল্ক গোয়েন্দা তদন্তঅধিদপ্তর। মামলার তদন্ত করে সিআইডি। তদন্তে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে শতকোটি টাকারও বেশি শুল্ক ফাঁকিরতথ্য মেলে।

এর আগে ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জের মাসুদ প্যাকেজিং, মেসার্স ইসলাম অ্যাসোসিয়েটসসহকয়েকটি প্রতিষ্ঠান ব্যক্তির বিরুদ্ধে ভুয়া নথি তৈরি করে ডুপ্লেক্স বোর্ড কাগজ আমদানি করে চোরাকারবারিরঅভিযোগে মামলা করে শুল্ক গোয়েন্দা তদন্ত অধিদপ্তর। আদমজী ইপিজেড কেন্দ্রিক মেসার্স আঙ্কেলপ্যাকেজিং লিমিটেড এর নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগে মামলা করা হয়। এসবমামলা সিআইডি তদন্ত করে তথ্য পায় ব্যাংকের সঙ্গে আঁতাত করে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের সঙ্গে নিয়ে ভুয়াপ্রতিষ্ঠান বন্ড জালিয়াতির।

চট্টগ্রামের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মিজানুর রহমান দীপু চাকলাদার হাবিবুর রহমান অপু চাকলাদার নামের দুইসহোদরের শুল্ক ফাঁকি চোরাকারবারে জড়িত থাকার অভিযোগ পেয়ে তদন্তে নামে শুল্ক গোয়েন্দা তদন্তঅধিদপ্তর। এরপর দীপুকে গ্রেফতার করেন শুল্ক গোয়েন্দারা। ২০১৩ সালের ২৩ জানুয়ারি মামলাটিসিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়। অপুর মালিকানাধীন মেসার্স চাকলাদার সার্ভিস এবং দীপুর মালিকানাধীনএমআর ট্রেডিংয়ের সঙ্গে কাস্টমস কমিশনার একেএম নুরুজ্জামান এর সখ্যতা থাকায় সার্বিক সহযোগিতাকরেন তিনি।

ওই মামলায় দীপু ছাড়াও চারজনকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। তাঁরা হলেন চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের দৈনিকমজুরিভিত্তিক কর্মী সোহরাব হোসেন ওরফে রিপন, ডেসপাচ শাখার কর্মচারী সিরাজুল ইসলাম, এআইআরশাখার উচ্চমান সহকারী মাসুম মফিজুল ইসলাম লিটন নামের এক আমদানিকারক। মফিজুল ইসলামলিটন ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। লিটন অপুদীপুর চোরাকারবার শুল্ক ফাঁকি সম্পর্কেগুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন। লিটন তার জবানবন্দিতে উক্ত সিন্ডিকেটের সহায়তাকারী শেল্টারদাতা হিসেবে একেএমনুরুজ্জামানের নাম প্রকাশ করেন। কিন্তু নুরুজ্জামান থেকে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে। নূরুজ্জামান ছিলেনচোরাকারবারিদের শেল্টার দিয়ে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। তার এই অবৈধ টাকা পাচার করেছেনলন্ডন অস্ট্রেলিয়ার। নুরুজ্জামান একাধিক মামলার আসামি হয়েও টাকা জোরে তাকে জেল হাজতে যেতেহয়নি। কারণ তিনি ম্যানেজ করার সব বিষয়ে পারদর্শী।

অভিযোগে আরো জানা যায়, সাবেক ভ্যাট কমিশনার একেএম নুরুজ্জামান ২০১১ সালে ঢাকা পূর্বে বন্ডকমিশন থাকা অবস্থায় দেদারসে কামিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। এরপর ২০১৯ সালে চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্মরত অবস্থায় বেহিসেবি অবৈধ টাকা কামিয়েছেন। চট্রগ্রাম থাকাকালীন সময়ে কয়েকশকোটি টাকা হাতিয়েনিয়েছেন বলে অভিযোগ জানা গেছে। ২০২২ সালে ঢাকা পান গাও সিগারেট মদ কন্টিনার গায়েবের মামলায়আসামি হন সাবেক ভ্যাট কমিশনার একেএম নুরুজ্জামান। মামলা টি মহামান্য হাইকোর্ট চলমান রয়েছে।ওই মামলার বাদি সিএন্ডডেপ কমাকেশন এমদাদ। মামলা থেকে রেহাই পেতে গণভবনে গিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রীশেখ হাসিনার নিজস্ব তহবিলে জমা দিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। গায়ে কাদামাখানো এই কর্মকর্তা নানাধরনের কৌশল অবলম্বন করে মামলা থেকে বাচার জন্য ছিলেন মরিয়া। এজন্যতদবির বাজনুরুজ্জামানহিসেবে খ্যাত অর্জন করেছেন। নুরুজ্জামান চট্টগ্রামে পোস্টিং থাকা অবস্থায় বারশকন্টিনারচুরির সাথে জড়িতছিলেন। ওই মামলায় তার সাথে আরেক আসামি হলেন সিএন্ডডেপ মিজানুর রহমান। তিনিএম আর ট্রেডিং কোম্পানির মালিক। ওই ১২শকন্টিনারে ছিলো ফেব্রিকস (কাপড়) ওই মামলাটি ধামাচাপাদিতে সাবেক আইনমন্ত্রীকে মোটা অংকের টাকা দিয়েও ব্যর্থ হয়েছেন নুরুজ্জামান। মামলাটি চলমান রয়েছে।

নুরুজ্জামানপাপিয়া দম্পতির এক ছেলে দাইয়ান এক মেয়ে নিশাত। মেয়ে নিশাতের দুই বছর আগে বিয়েহয়েছে। বর্তমানে মেয়ে লন্ডনে বসবাস করেন। নুরুজ্জামানের অস্ট্রেলিয়াতে আলিশান বাড়ি, গাড়ি সম্পতিআছে বলে জানা গেছে। তিনি চাকরি থাকাকালীন সময়ে মেয়ে নিশাতকে নিয়ে ঘন ঘন অস্ট্রেলিয়া লন্ডন সহবিভিন্ন দেশে যেতেন। যাওয়ার সময় মেয়ে নিশাত টাকা ডলার করে লাকেজে ভরে নিয়ে যেতেন। বাবার দাপট ক্ষমতার কারণে লাকেজ চেক করা হতোনা। গোয়েন্দা সংস্থা কাস্টম গোয়েন্দারা চেকের বদলে ডলার ভর্তিলাকেজ এগিয়ে দিতেন। এভাবে শত শত কোটি টাকা পাচার করেছেন নুরুজ্জামান তার মেয়ে নিশাত। দেশেরঅর্থ পাচার করে বিদেশে বাড়ি বানিয়ে এবং ব্যবসায় টাকা বিনিয়োগকারী একেএম নুরুজ্জামান রয়েছেনধরাছোঁয়ার বাইরে।

অভিযোগের বিষয়ে জানার জন্য একেএম নুরুজ্জামানের মূঠো ফোনে একাধিক বার ফোন করলে তিনি রিসিভকরেননি। ওয়াটসআপে বার্তা পাঠিয়েও কোন উত্তর মিলেনি।

এ জাতীয় আরো খবর..
Classic Software Technology

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত আজকের অর্থনীতি ২০১৯।

কারিগরি সহযোগিতায়: