
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শাহজাহান মিয়াকে একসঙ্গে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে অব্যাহতি দিয়েছে সরকার। দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগের মুখে থাকা এই অতিরিক্ত সচিবকে সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দাখিল করা এক আবেদনের পর সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেয়।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ৩০ অক্টোবরের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, জনস্বার্থে শাহজাহান মিয়াকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক এবং ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এর আগে, ২৯ অক্টোবর তাকে স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিবের দায়িত্ব থেকেও সরিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়। ফলে এখন থেকে তিনি শুধুমাত্র দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
বিতর্কের শুরু ও অভিযোগের পটভূমি
গত ১৩ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শাহজাহান মিয়াকে ডিএসসিসির প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে ১৮ মে তিনি ঢাকা ওয়াসার এমডির দায়িত্বও পান।
কিন্তু মাত্র নয় মাসের মাথায় তার বিরুদ্ধে ওঠে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ। গত ১৪ সেপ্টেম্বর ফরিদপুরের বাসিন্দা মো. শাকিল আহমেদ দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) এক লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে বলা হয়, শাহজাহান মিয়া রাষ্ট্রের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদ একত্রে দখল করে শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও প্রভাব খাটিয়েছেন। অভিযোগের কপি সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হলে দ্রুত বিষয়টি নজরে আসে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ভেতরের অস্থিরতা ও দুর্নীতির অভিযোগ
ডিএসসিসির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর শাহজাহান মিয়া দুর্নীতিগ্রস্ত সিন্ডিকেটকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন। তারা দাবি করেন, জ্বালানি ও গ্যাস চুরি, পরিবহন বিভাগে অনিয়ম, রাজস্ব আদায়ে অনৈতিক প্রভাব—সবখানেই প্রশাসকের ছায়া ছিল স্পষ্ট। এমনকি, মে ও জুন মাসে ৪৩ দিন ধরে নগর ভবন বন্ধ থাকলেও শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনায় কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি।
নাম না প্রকাশের শর্তে ডিএসসিসির একাধিক কর্মকর্তা জানান, গত সাড়ে ৯ মাসে মো.শাহজাহান মিয়া ডিএসসিসির প্রশাসকের চেয়ারে বসে পরিকল্পিতভাবে এই প্রতিষ্ঠানকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিনত করেছেন। ফ্যাসিস্ট সরকারের সাবেক মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলেনুর তাপসের রেখে যাওয়া চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা, কর্মচারীদের পুষ্টপোষকতা করেছেন।
কোটি কোটি টাকার জ্বালানি তেল ও গ্যাস চুরির অভিযোগ ওঠা পরিবহন বিভাগের মহা ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ নাছিম আহমেদ, পরিবহন বিভাগের কর্মকর্তা আরিফ চৌধুরী এবং পরিবহন চালকদের মধ্যে প্রশাসকের ড্রাইভার,
ডিএসসিসি এর বিবিধ আদায় শাখা অঞ্চল- ১ এর কর কর্মকর্তা মোহাঃ আবু নাসের (কচি), অঞ্চল- ৪ কর কর্মকর্তা আতাহার আলী খানসহ চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটকে রক্ষায় সবধরনের চেষ্টা করেছেন।
সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ ও প্রতিক্রিয়া
প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে সরকার যখন প্রশাসনে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে “জিরো টলারেন্স” নীতি বাস্তবায়নে জোর দিচ্ছে, তখন শাহজাহান মিয়াকে একযোগে তিন দায়িত্ব থেকে সরানো সেই অবস্থানেরই প্রতিফলন। তবে শাহজাহান মিয়া এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।