
পাইপলাইনের পানি পৌঁছায় না—এমন এলাকায় নিরাপদ পানি সরবরাহে ঢাকায় চালু হওয়া ‘ওয়াটার এটিএম’ মডেল এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। সরকারি পানি সরবরাহকারী সংস্থার সঙ্গে অংশীদারত্বে বেসরকারি খাতের অর্থায়ন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের এই ব্যবস্থা কীভাবে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করা যায়, তা নিয়ে সুইডেনের স্টকহোমে অনুষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড ওয়াটার উইক ২০২৬’-এর দুটি গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থায়নের ক্ষেত্রেও এ মডেলকে সম্ভাবনাময় কাঠামো হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত সপ্তাহে স্টকহোমে অনুষ্ঠিত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পানি বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘ওয়ার্ল্ড ওয়াটার উইক ২০২৬’-এ অংশ নেন ড্রিংকওয়েলের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মিনহাজ চৌধুরী। সম্মেলনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে তিনি বাংলাদেশের ওয়াটার এটিএম মডেল এবং এ খাতে ড্রিংকওয়েলের কার্যক্রম তুলে ধরেন।
এর একটি ছিল নেদারল্যান্ডসভিত্তিক সংস্থা ‘অ্যাকুয়া ফর অল’-এর উদ্যোগে আয়োজিত ‘রিচিং দ্য মোস্ট ভালনারেবল থ্রু ইনোভেটিভ ইনভেস্টমেন্ট অ্যাপ্রোচেস’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনা। অন্যটি ছিল ইউনিসেফের ‘ইনোভেশন শার্ক ট্যাংক’।

দুই অধিবেশনেই বাংলাদেশের এমন একটি ব্যবস্থা তুলে ধরা হয়, যেখানে সরকারি পানি সরবরাহকারী সংস্থা জমি, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। অন্যদিকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ওয়াটার এটিএম স্থাপনে অর্থায়ন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেয়। আয় থেকে নির্ধারিত নিয়মে অংশীদারদের মধ্যে রাজস্ব ভাগাভাগি করা হয়।
আন্তর্জাতিক পানি খাতে এখন বড় প্রশ্ন হচ্ছে—পাইপলাইনভিত্তিক পানি সরবরাহের বাইরে থাকা মানুষের কাছে কীভাবে নিরাপদ পানি পৌঁছে দেওয়া যায় এবং নির্মাণের পর কীভাবে এসব অবকাঠামো সচল ও টেকসই রাখা যায়। স্টকহোমের সম্মেলনে বাংলাদেশের ওয়াটার এটিএম মডেলকে এ সমস্যার একটি সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে তুলে ধরা হয়।
অ্যাকুয়া ফর অল-এর প্যানেল আলোচনায় মিনহাজ চৌধুরী বলেন, বর্তমানে ড্রিংকওয়েল বাংলাদেশের সব পানি সরবরাহকারী সংস্থার সঙ্গে কাজ করছে। ঢাকায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ২০০ কোটি লিটারের বেশি পানি সরবরাহ করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন পানি সরবরাহকারী সংস্থার মধ্যে এ মডেল সম্প্রসারণ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
আলোচনায় পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি খাতে বৈশ্বিক অর্থায়নের চিত্রও উঠে আসে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের যৌথ পর্যবেক্ষণ কর্মসূচির সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, এ খাতে বৈশ্বিক অর্থায়নের মাত্র প্রায় ২ শতাংশ বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ হিসেবে যায়।
মিনহাজ চৌধুরী জানান, ২০১৮ সালে যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস (এফসিডিও) এবং জিএসএমএ-এর যৌথ অনুদান কর্মসূচির মাধ্যমে ওয়াটার এটিএম মডেলের অর্থায়নের ভিত্তি তৈরি হয়। পরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অংশীদারের সহযোগিতায় এ মডেলের জন্য একটি বহুমুখী অর্থায়ন কাঠামো গড়ে ওঠে।
অ্যাকুয়া ফর অল-এর সঙ্গে গড়ে তোলা ফলাফলভিত্তিক অর্থায়ন ব্যবস্থায় সংগৃহীত ঋণ বা মূলধনী বিনিয়োগের প্রতি ১ ডলারের বিপরীতে অতিরিক্ত ৩০ সেন্ট সহায়তা দেওয়া হয়। তবে এ সহায়তা নির্দিষ্ট ফলাফল অর্জনের সঙ্গে যুক্ত।
এর মধ্যে রয়েছে শহরের দুর্গম ও তুলনামূলক কম বিক্রির এলাকায় ওয়াটার এটিএম পরিচালনা নিশ্চিত করা, নারী বুথ পরিচালকের সংখ্যা বাড়ানো এবং ঢাকার বাইরে কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা।

মিনহাজ চৌধুরীর ভাষ্য অনুযায়ী, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনকে দেওয়া ১১ কোটি ৬০ লাখ ডলারের পাইপলাইনভিত্তিক পানি সরবরাহ প্রকল্পের আওতায় ২৬টি ওয়ার্ডে ২৬টি ওয়াটার এটিএম স্থাপনের জন্য অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, বড় ধরনের পাইপলাইনভিত্তিক পানি সরবরাহ প্রকল্প বাস্তবায়নে কয়েক বছর সময় লাগলেও ওয়াটার এটিএম কয়েক সপ্তাহের মধ্যে চালু করা সম্ভব।
অবকাঠামো নির্মাণের পর রক্ষণাবেক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশে অনেক সময় সর্বনিম্ন ব্যয়ের ভিত্তিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। এতে অবকাঠামো নির্মাণের পর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তা অবহেলিত হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
এ কারণে শুধু নির্মাণকাজের ওপর অর্থায়ন না করে সেবার কার্যকারিতা ও নিরবচ্ছিন্ন পরিচালনার ভিত্তিতে অর্থায়নের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, লক্ষ্য হওয়া উচিত অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি তা নিয়মিত পরিচালনা ও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই রাখা।
মিনহাজ চৌধুরী জানান, একটি সরকারি ঋণভিত্তিক প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রাথমিক সমীক্ষা থেকে দরপত্র আহ্বান পর্যন্ত প্রায় সাত বছর সময় লেগে যেতে পারে। অন্যদিকে বাংলাদেশের ওয়াটার এটিএম মডেলকে কেন্দ্র করে বহুমুখী অর্থায়ন কাঠামো গড়ে তুলতে সময় লেগেছে প্রায় ১৩ বছর।
এখন তাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে শহরভিত্তিক দীর্ঘ প্রকল্পচক্রের পরিবর্তে দেশব্যাপী সমন্বিত ও দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
পরে ইউনিসেফের ‘ইনোভেশন শার্ক ট্যাংক’ অধিবেশনেও ড্রিংকওয়েলের প্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক মডেল তুলে ধরেন মিনহাজ চৌধুরী।
তিনি ড্রিংকওয়েলের পানি পরিশোধন প্রযুক্তি, এর ব্যবহার, অর্থায়নের উৎস এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনা ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ড্রিংকওয়েলের ‘এইচআইএক্স-ন্যানো’ রেজিন প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রায় ৯০ শতাংশ পানি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। সাধারণ রিভার্স অসমোসিস পদ্ধতিতে পানি পুনরুদ্ধারের হার সাধারণত ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ।
এ প্রযুক্তি গৃহস্থালি পানি পরিশোধন ব্যবস্থা, সরকারি সংস্থার সঙ্গে অংশীদারত্বে পরিচালিত ওয়াটার এটিএম এবং পাইপলাইনভিত্তিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যবহার করা হচ্ছে।
পানি সরবরাহ ব্যবস্থার অর্থায়নের ক্ষেত্রে তিনি পানি বিল, কর ও সরকারি সহায়তা—এই তিনটি উৎসের কথা তুলে ধরেন।
দীর্ঘমেয়াদে সেবা টিকিয়ে রাখতে নাগরিকদের সম্পৃক্ততার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। ‘ওয়াটারগ্রেড’ নামের একটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নাগরিকরা নিজেদের ব্যবহৃত পানির মান মূল্যায়ন করতে পারেন। এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত মানুষের মধ্য থেকেই পরবর্তীতে কেউ কেউ ওয়াটার এটিএম নেটওয়ার্কের বুথ পরিচালনা ও কারিগরি কাজে যুক্ত হচ্ছেন বলে জানান তিনি।
ইউনিসেফের অনুশীলনে কাল্পনিক আধা-শুষ্ক শহর ‘লোদাহ’-এর জন্য একটি পানি সরবরাহ পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন মিনহাজ চৌধুরী।
তিনি নতুন করে বড় অঙ্কের অর্থায়নের পরিবর্তে বিদ্যমান ১০ কোটি ডলারের অবকাঠামো বিনিয়োগের মাত্র ১ শতাংশ আগামী ১০ বছরের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রাখার প্রস্তাব দেন।
পানি সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম কঠিন দিক হিসেবে তিনি রাজনৈতিক বাস্তবতার কথাও তুলে ধরেন। তার মতে, পানির মূল্য বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক সময় রাজনৈতিকভাবে কঠিন হয়ে পড়ে।
অধিবেশনে প্রতীকী বিনিয়োগ অনুশীলনে দর্শকদের ‘খেলার টাকা’ দিয়ে ড্রিংকওয়েলের উপস্থাপনায় প্রায় ২৯ লাখ ডলারের প্রতীকী বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়। এর মধ্যে দুটি ৫ লাখ ডলারের প্রতীকী নোটও ছিল।
তবে আয়োজকেরা স্পষ্ট করেছেন, এটি ছিল সম্পূর্ণ শিক্ষামূলক একটি অনুশীলন। এখানে কোনো প্রকৃত অর্থ বিনিয়োগ করা হয়নি এবং অধিবেশন থেকে কোনো তহবিলও দেওয়া হয়নি।
অধিবেশনে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের নগর উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ বিবেক রমন, নেদারল্যান্ডস এন্টারপ্রাইজ এজেন্সির ‘পার্টনারস ফর ওয়াটার’ কর্মসূচির সমন্বয়কারী লিলিয়ান গিয়ারলিং, ইউনিসেফের ওয়াশ বিশেষজ্ঞ শাজা এলখাওয়াদ এবং ইউনেসকোর অগাস্ট কিংলো বিনিয়োগকারীর ভূমিকায় অংশ নেন।
ওয়ার্ল্ড ওয়াটার উইক ২০২৬-এ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঢাকার দুর্গম ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় নিরাপদ পানি পৌঁছে দেওয়ার জন্য তৈরি একটি সেবা মডেল এখন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থায়নের সম্ভাব্য কাঠামো হিসেবে আলোচিত হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের এফসিডিও ও জিএসএমএ-এর প্রাথমিক সহায়তা থেকে শুরু করে বর্তমানে অ্যাকুয়া ফর অল ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততায় এ মডেল সম্প্রসারণের চেষ্টা চলছে।
মিনহাজ চৌধুরীর ভাষ্য অনুযায়ী, ড্রিংকওয়েলের কার্যক্রম সামাজিক ব্যবসা মডেলে পরিচালিত হয়। এ ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠানটি লভ্যাংশ দেয় না। পানির দামও ড্রিংকওয়েল নির্ধারণ করে না; সংশ্লিষ্ট সরকারি পানি সরবরাহকারী সংস্থাই পানির মূল্য নির্ধারণ করে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের ওয়াটার এটিএম মডেল উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে নিরাপদ পানি সরবরাহে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের একটি সম্ভাব্য উদাহরণ সামনে এসেছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় দ্রুত পাইপলাইনভিত্তিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থা পৌঁছানো সম্ভব নয়, সেখানে এ ধরনের ব্যবস্থা তুলনামূলক দ্রুত চালু করে নিরাপদ পানি সরবরাহ করা সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।