
দেশে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি ফিরছে না। বরং বছরের ব্যবধানে প্রয়োজনীয় বেশিরভাগ পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বাজার খরচ সামলাতে অনেক পরিবারকে খাবারের তালিকা ছোট করতে হচ্ছে। বাদ পড়ছে মাছ, মাংস, ডিম ও দুধের মতো পুষ্টিকর খাবার।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, আগের তুলনায় অনেক পণ্যের দাম বেড়েছে। ফলে আয় একই থাকলেও বাজার করতে গিয়ে অতিরিক্ত টাকা খরচ হচ্ছে। পরিবারের প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে গিয়ে অনেকেই বাধ্য হচ্ছেন কম গুরুত্বপূর্ণ পণ্য বাদ দিতে।
মিরপুর-১২ এলাকার আলুব্দী বাজারে সাপ্তাহিক বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী মো. এনামুল হক জানান, দাম বেড়ে যাওয়ায় তিনি বাজারের তালিকা থেকে গুঁড়া দুধ, তরল দুধ, গরুর মাংস, মাছ ও তুলনামূলক দামি সবজি বাদ দিয়েছেন।
তিনি বলেন, পেঁয়াজ, চিনি, মসলা, আটা, মুরগি ও ডিমের পরিমাণও কমিয়েছেন। এরপরও বাজারে এসে নির্ধারিত বাজেটের মধ্যে হিসাব মেলাতে পারেননি। ফলে আরও কয়েকটি পণ্য তালিকা থেকে বাদ দিতে হয়েছে।
এনামুলের মতোই চাপে রয়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। কদমতলী এলাকার অটোরিকশাচালক মো. হাবিবুর রহমান বলেন, সামান্য আয়ে প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। মাছ-মাংসের মতো পণ্য কেনা অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়েছে। কয়েকটি প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতেই ৫০০ টাকা শেষ হয়ে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই মাসে দেশের মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমেছে। জুন মাসে এ হার ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতিও ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ থেকে কমে ৭ দশমিক ১৬ শতাংশ হয়েছে।
তবে মূল্যস্ফীতির হার কমলেও বাজারে ভোক্তাদের ব্যয়ের চাপ কমেনি। চাল, ডাল, পেঁয়াজ ও আদাসহ কয়েকটি পণ্য ছাড়া বছরের ব্যবধানে অধিকাংশ নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে।
বাজারে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ভোজ্যতেলের দাম। এক বছরে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ১৮৮ টাকা থেকে বেড়ে ১৯৯ টাকা হয়েছে। খোলা সয়াবিন তেল ১৬৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৯২ টাকা এবং পাম তেল ১৫০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬৫ টাকা হয়েছে।
এ ছাড়া গরু ও মুরগির মাংস, ডিম, দুধ ও মাছের দামও বেড়েছে। পাঙ্গাশ ও তেলাপিয়া মাছের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ছোট চিংড়ির দাম গত বছরের ৬০০ টাকা থেকে বেড়ে বর্তমানে ৮০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। সম্প্রতি আটা ও চিনির দামও কেজিতে ৫ টাকা করে বেড়েছে।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের তথ্যেও নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার চিত্র পাওয়া গেছে। এক বছরে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ৫ দশমিক ২৯ শতাংশ, খোলা সয়াবিন ১২ দশমিক ১৭ শতাংশ এবং পাম তেলের দাম ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে গরুর মাংস, ব্রয়লার মুরগি, ডিম ও গুঁড়া দুধের দামও বেড়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৬০ শতাংশের বেশি পরিবার তাদের আয়ের অন্তত অর্ধেক খাবারের পেছনে ব্যয় করে। নিম্ন আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে এ চাপ আরও বেশি। খাদ্যের দাম বাড়ায় অনেক পরিবারকে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য মৌলিক খাতে ব্যয় কমাতে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি কমলেও মানুষের বাস্তব জীবনে স্বস্তি ফেরেনি। বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে মধ্যস্বত্বভোগীর আধিক্য এবং দুর্বল নজরদারির কারণে ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, চালসহ বিভিন্ন শস্যের দাম স্থিতিশীল থাকায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমেছে। তবে সাধারণ মানুষের জন্য প্রকৃত স্বস্তি আনতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরও কমিয়ে ২ থেকে ৩ শতাংশের মধ্যে আনতে হবে। এজন্য উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সরবরাহ ও বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত করা জরুরি।
বাজার বিশ্লেষক গোলাম রহমান বলেন, পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হবে। মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা কমানোর পাশাপাশি আমদানিনির্ভর পণ্যে প্রতিযোগিতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে চাঁদাবাজি ও অতিরিক্ত পরিবহন খরচ বন্ধ করা প্রয়োজন।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, মূল্যস্ফীতি কমার সরকারি পরিসংখ্যানের সঙ্গে বাজারের বাস্তব চিত্রের মিল নেই। প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল না হলে কাগজে-কলমে মূল্যস্ফীতি কমলেও সাধারণ মানুষের বাজারের তালিকা আরও ছোট হবে, আর মাসিক খরচের হিসাব বড় হতে থাকবে।